১৫ নভেম্বর ২০০৪। বাংলা চলচ্চিত্রে এই তারিখের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ সেদিন একইসঙ্গে মুক্তি পেয়েছিল তৌকীর আহমেদ ও হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দুই চলচ্চিত্র ‘জয়যাত্রা’ ও ‘শ্যামল ছায়া’। দুটোর কাহিনিই নদী-নৌকাযাত্রাকে কেন্দ্র করে, দুটোতেই সাধারণ মানুষের চোখে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছিল। তবে দুটির নির্মাণভাবনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আজকের টাইমস ক্লাসিকের আলোচনা এ দুটি ‘অসাধারণ’ চলচ্চিত্র নিয়ে।
‘জয়যাত্রা’ তৌকীর আহমেদের প্রথম সিনেমা। এটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে। ছোটবেলায় পাকিস্তানের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে যুদ্ধের বাস্তবতা বুঝতে শিখিয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি। সেই স্মৃতিই তাকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি বানানোর দিকে নিয়ে যায়। তার ভাষায়, ‘জয়যাত্রা’ যেন তার নিজের ভেতরের যুদ্ধের প্রতিধ্বনি।
‘জয়যাত্রা’র গল্প শুরু হয় এক শান্ত গ্রাম দিয়ে। যেখানে দেখানো হয়, পরিবার, সম্পর্ক, মৌসুমভিত্তিক আনন্দ আর রাজনীতির প্রতি অজ্ঞতা। তারপর রাতের আঁধারে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। বেঁচে থাকা মানুষগুলো নৌকায় উঠে সীমান্তের দিকে পাড়ি দেয়, আর সেখান থেকেই শুরু মূল কাহিনীর। বেঁচে থাকার তাগিদ, ভয়, সন্দেহ, বিশ্বাসের ভাঙন আর প্রতিরোধে ধীরে ধীরে জেগে ওঠা সাধারণ মানুষের গল্প ‘জয়যাত্রা’।
তৌকীর বিভিন্ন চরিত্রের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন যুদ্ধের সময়কার মানুষের মানসিক টানাপোড়েন। একই নৌযাত্রায় দেখা যায় লুট করে পালানো এক স্বার্থপর চরিত্র, আবার দেখা যায় মানবিকতার গল্প। মৃত্যু, জন্ম, নতুন জীবনের আগমন; সব মিলিয়ে ছবিটি যুদ্ধের অন্ধকারে জীবনের প্রবাহকেই তুলে ধরে।
নৌ ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় যুদ্ধজাহাজ, বিমান, সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে ছবির আবহ গড়ে তুলেছিলেন তৌকীর। দুই ঘণ্টার এই সিনেমার দৃশ্যায়ন এত টানটান যে দর্শকও আটকে যায়।
পরে ‘জয়যাত্রা’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে স্বীকৃতি পায়। হলের ব্যবসায়িক সাড়া কম হলেও ছবিটি সময়ের সঙ্গে বাড়িয়েছে নিজের গুরুত্ব। নতুন প্রজন্মকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য।
অন্যদিকে, হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ এসেছে তার সাহিত্যিক ভাবনার ধারাবাহিকতায়। যুদ্ধ তাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল আরও ব্যক্তিগতভাবে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তা বাবার হত্যাকাণ্ড, পালিয়ে থাকা দিনগুলো, পরিবারকে আগলে রাখার সংগ্রাম বিভিন্ন সময়ই তার লেখায় উঠে এসেছে। তার উপন্যাসে—‘নির্বাসন’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’—যুদ্ধের ছাপ বারবার ফিরে এসেছে।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘শ্যামল ছায়া’। সে উপন্যাস অবলম্বনেই পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদ ছবিটি নির্মাণ করেন।
এই গল্পেও আছে নৌযাত্রা, কিন্তু সেই যাত্রার গল্প বলার ধরণ আলাদা। এখানে যাত্রার সঙ্গী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা; এরা হলেন হুমায়ূন, জাফর, আনিস, মজিদ আর মাঝি হাসান আলি। তারা যাচ্ছে মেথিকান্দা ক্যাম্প দখলের প্রস্তুতি নিতে; যে ক্যাম্প আগের আক্রমণে বহু যোদ্ধার মৃত্যুর কারণে পরিচিত ছিল মৃত্যুকূপ নামে। গল্প এগিয়েছে তাদের কথায়—ভয়, দ্বিধা, আগের অভিজ্ঞতা, আর এক ধরনের অবশ্যম্ভাবী নিয়তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বোধ নিয়ে।
হাসান আলির চরিত্রটি এই উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জটিল স্তর। দু’মুঠো ভাতের আশ্বাসে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিলেও সে খুব দ্রুত বুঝে যায় ভুলটা কোথায়। হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়া, লুটপাট, খুন—সবকিছু তার বিবেককে টেনে আনে অন্যদিকে। শেষ পর্যন্ত সে ঠিক করে মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দেবে। তার এই আত্মসমালোচনা দেখায় যুদ্ধ শুধু ফ্রন্টলাইনে নয়, মানুষের ভিতরেও বড় এক লড়াই।
হুমায়ূন আহমেদ জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের মানবিক টানাপড়েন খুব স্বাভাবিকভাবে ধরে ফেলেছেন। ছোট ছোট ঘটনা, যেমন কোনো পরিবারের আশ্রয় দেওয়া, পথের মানুষের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া, আহত যোদ্ধাকে সেবা করা; সব মিলিয়ে বোঝা যায়, যুদ্ধ সাধারণ মানুষের হাতেও লেখা।
দুটি চলচ্চিত্রই যুদ্ধের গল্প বলে, কিন্তু দুটোর গল্পের ধাঁচ ভিন্ন। ‘জয়যাত্রা’ যাত্রার ভেতরেই যুদ্ধকে দেখায়। তুলে ধরে বিশৃঙ্খলা, ধ্বংস, বেঁচে থাকার লড়াই আর নতুন জন্মের প্রতীক। ‘শ্যামল ছায়া’ যুদ্ধের আগে, যুদ্ধের মুহূর্ত আর যুদ্ধের প্রস্তুতির মানসিকতা নিয়ে কাজ করে; অভিযানের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষের ভেতরের ভয়, অপরাধবোধ, দৃঢ়তার ছবি আঁকে।
তবু দুটি ছবি শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় এসে মিলে যায়। আর সেটা হলো স্বাধীনতার জন্য মানুষের অদম্য ইচ্ছা, ভয়ের মাঝেও এগিয়ে যাওয়ার শক্তি, আর সেই সময়টার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা।
১৫ নভেম্বর ২০০৪ তাই কেবল দুই ছবির মুক্তির দিন নয়; যুদ্ধের স্মৃতি দুই ভিন্ন ভাষায় বলার এক বিরল মুহূর্ত।


