ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরে বেড়ানো শিশুদের একজন আনুমানিক ১০ বছর বয়সী সাদিক (ছদ্মনাম)। তার জীবন চলছে এই উদ্যানকে ঘিরেই। ছোটবেলায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানোর পর ক্র্যাচের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ফুল বিক্রি করে চলত তার জীবন। বাড়তি আয়ের প্রয়োজন হওয়ায় মা তাকে ফের উদ্যানে নিয়ে আসে, বর্তমানে সে উদ্যানেই মাদক বিক্রি করে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাসমান শিশুদেরকে নানা কৌশলে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে মাদকচক্রে। দিনেদুপুরেই এই উদ্যানে সক্রিয় একটি চক্র, যারা মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেখানেই বসবাস করে। তাদের খপ্পরে পড়েই সাদিকের মতো শিশুরা হয়ে যাচ্ছ বাহক। পরে তারাই মাদকে আসক্ত হয়ে যায়।
উদ্যানের ভেতরে ‘ফুল ক্যানটিন’ নামে পরিচিত একটি স্থানে বসে গল্প করছিলেন ১০ থেকে ১২ জন মানুষ। তাদের কেউ কেউ শিশুদের সঙ্গে খেলায় মেতেছিলেন।
সেদিকে আঙুল দেখিয়ে সাদিক বলে, ‘এখানে যারা আছি, আমরা সবাই এক পরিবার, একসঙ্গে থাকি।’তার মতো আরও অন্তত অর্ধশতাধিক শিশু এই চক্রের শিকার।’

শাহবাগ থানার এক কর্মকর্তা জানান, আগে উদ্যানের ‘ফুল ক্যানটিন’ নামে একটি স্থানে ফুলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন। উদ্যানে বসবাসকারী বেশ কয়েকজন ভাসমান শিশুকেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই চক্রে।
উদ্যানের মাদকচক্রে সাধারণত ৮ থেকে ১৬ বছরের শিশুদের ব্যবহার করা হয়। কারণ, অভিযানে ধরা পড়ার পর কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এদের অনেকেই আগে ফুল, পান, সিগারেট ও পানি বিক্রির কাজে যুক্ত ছিল। পরে বাড়তি আয়ের আশায় তারা এই চক্রে জড়িয়ে পড়ে। গাছের নিচে, অস্থায়ী ক্যানটিনে কিংবা খোলা ঘাসের ওপরও বসতি গড়ে তোলে তারা।
শাহবাগ থানার অপারেশনস কর্মকর্তা বলেন, ‘শিশুদের ক্ষেত্রে আইন আলাদা। অভিযোগও আলাদা, তদন্তও আলাদা। আমরা তাদের আদালতে সোপর্দ করি। পরে তাদের জামিন বা মুক্তির বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার।’
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসবাসকারী অনেকেই এখানেই জন্ম, বেড়ে ওঠা, এমনকি বিয়ে ও মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন। তাদের একটি অংশ নিজেদের একটি ‘পরিবার’ হিসেবেই পরিচয় দেয়। সেখানে বসবাস করে বিয়ে করেছেন স্মৃতি ও মোহাম্মদ আকাশ।
আকাশ প্রায় ১২ বছর ধরে এখানে আছেন, স্মৃতির জীবনের ৩০ বছর এখানেই কেটেছে। আগে তিনি ফুল বিক্রি করতেন, পরে গাঁজার বিক্রিতে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পেলে সে বিক্রি করে, সে ভয় পেলে আমি বিক্রি করি। দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাভ হয়।’

উদ্যানে এমন কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে, যারা নিজেদের মতো করে ‘পরিবার’ হিসেবে পরিচয় দেয়। ‘ফুল ক্যানটিনে’ এ উপস্থিত একজন জানান, পারুলি আগে ফুলের ব্যবসা করতেন। পরে নবী নামের একজন এসে অনেককে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার পর কিছু গ্রুপের কার্যক্রম কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে বলেও জানান স্মৃতি।
তিনি বলেন, ‘সাম্য ভাই মারা যাওয়ার পর মেহেদী ভাইয়ের গ্রুপের কবুতর আব্বু, আবু, রিপন ভাই, মকবুল ভাইসহ অনেকেই ধরা পড়ে। এখন তারা আর সক্রিয় নেই।’
স্মৃতির তথ্য বলছে, একসময় উদ্যানে এই কারবারের নেতৃত্বে ছিলেন মেহেদীর মা ‘মুক্তা খালা’। শহীদ মিনার থেকে খিচুড়ি পট্টি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। পরে তিনি হৃদরোগে মারা যান।
বর্তমানে উদ্যানে নবী, আলিকা, রেখা খালা ও রাব্বির গ্রুপগুলো বেশি সক্রিয় বলে জানান আকাশ। এটি বাইরে থেকে যতটা বিশৃঙ্খল মনে হয়, ভেতরে ততটাই সংগঠিত বলে মন্তব্য করেন পাঁচ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হুমায়ুন।

তিনি বলেন, এই কারবারে ধাপে ধাপে প্রবেশ করা হয়। প্রথমে নতুনরা ছোট কাজ করে, পরে ধীরে ধীরে বড় ব্যবসায়ীদের ঘনিষ্ঠ হয়ে দায়িত্ব নেয়। এরপর শুরু হয় নিয়ন্ত্রণের লড়াই।
পুলিশের অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্রেতারা দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। অনেকেই গাঁজার প্যাকেট মাটিতে ফেলে দেয় বা লুকিয়ে রাখে। কেউ আবার পোশাকের ভাঁজে বা গোপন পকেটে রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খায়রুল চৌধুরী বলেন, ‘মাদকের বিষয়টিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হবে না। এটি শিশু নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিতের দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে।’
পথশিশুদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পথশিশু আসলে কোনো স্বাভাবিক পরিচয় না, এটি রাষ্ট্র ও পরিবারের সংকটের বহিঃপ্রকাশ। একটি রাষ্ট্র কতটা অমানবিক হলে শিশুদের রাস্তায় থাকতে হয়, সেই প্রশ্নটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
সরকার পরিচালিত এতিমখানা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন এসব শিশু রাস্তায় থাকবে এই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘তাদের বাধ্যতামূলক শিক্ষা, বোর্ডিং স্কুল, পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা সম্ভব।’


