ছায়ানটে হামলা: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে উন্মত্ত আঘাত

ছায়ানটে হামলা: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে উন্মত্ত আঘাত
Advertisement
Advertisement

বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম প্রধান বাতিঘর ‘ছায়ানটে’ নেমে এল এক বিভীষিকাময় রাত। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) গভীর রাতে একদল উন্মত্ত জনতা রাজধানীর ধানমন্ডির শংকর এলাকায় অবস্থিত ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ড চালায়। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক এই প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন আঘাত দেশের সাংস্কৃতিক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাত প্রায় ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল মিছিল নিয়ে ছায়ানট ভবনের সামনে জড়ো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলাকারীরা ‘নারায়ে তাকবীর’, ‘ভারতের দালাল’ ও ‘নাস্তিক’ বলে স্লোগান দিতে দিতে ভবনের প্রবেশপথ ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা পার্কিং লটে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সাততলা ভবনের বিভিন্ন তলায় তাণ্ডব চালায়।

হামলাকারীদের তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি কিছুই। ভবনের প্রতিটি তলায় থাকা শ্রেণিকক্ষ, অফিস এবং মিলনায়তনে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সংগীতের ওপর; হামলাকারীরা ঐতিহ্যবাহী তবলা, হারমোনিয়াম ও তানপুরাসহ অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং তিনতলার লাইব্রেরিতে স্তূপ করে মূল্যবান বই ও নথিপত্র পুড়িয়ে দেয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক সনজীদা খাতুনের প্রতিকৃতিও তারা ছিঁড়ে ফেলে। সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম ও মূল্যবান শিল্পকর্ম তছনছ করে এক বিধ্বস্ত অবস্থায় রেখে যায় প্রতিষ্ঠানটিকে।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এই ঘটনাকে ‘সৃজনশীলতা ও ইতিহাসের শত্রু’ বলে অভিহিত করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ছায়ানট এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও সৃজনশীলতার অনন্য কেন্দ্র। এই ভবনে যারা আগুন দেয়, তারা এই জনপদের ইতিহাস-সংস্কৃতি মুছে ফেলতে চায়। তারা মানুষের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি, শিক্ষা এবং সৃজনশীল উদ্যমের শত্রু।’ তিনি এই ‘মব সন্ত্রাস’ ও ‘মাস্তানতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন

‘ফৌজদারি অপরাধ’ এবং তা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থি’ বলে মন্তব্য করেছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেছেন, ওই হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার বিষয়ে সরকার ‘কাজ করছে’।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক বিবৃতিতে শরীফ ওসমান হাদিকে ‘বিপ্লবী রক্তে উজ্জীবিত প্রতিবাদের আইকন’ হিসেবে বর্ণনা করলেও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে সহিংসতা ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। সরকার এই ভাঙচুরের বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে।

ছায়ানটের হামলার ঘটনায় অনেক অভিভাবক কান্নায় ভেঙে পড়েন। গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা তো একটা স্কুল, এখানে ছোট ছোট বাচ্চারা শেখে। ওরা আমার সন্তানের স্কুলটা জ্বালিয়ে দিল কেন? অথচ পুলিশ পাশে থেকেও তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি।’

বর্তমান অবস্থা হামলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তনের সকল ক্লাস ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। জুমার নামাজের পর আবারও হামলার আশঙ্কায় শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল থেকেই ভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছিল। বর্তমানে পুরো ভবনটিকে পুলিশি কর্ডনে রাখা হয়েছে এবং ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে।

বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘বর্ষবরণ’ যেখান থেকে শুরু হয়, সেই ছায়ানটের ওপর এই আঘাত মূলত মুক্তবুদ্ধির ওপর আঘাত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শোকাতুর শিল্পীসমাজ বলছেন, ২০০১ সালে বোমা হামলার পরেও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি এবারও তারা এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই সংস্কৃতির মশাল জ্বালাবেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad