প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৬২ বছর পর প্রথমবারের মতো অগ্নিনির্বাপণ খাতে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৪ সালে হাসপাতালটি চালু হওয়ার পর থেকে এই খাতে এতদিন কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল প্রশাসন তৎপর হওয়ায় মন্ত্রণালয় থেকে এই জরুরি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে পুরো হাসপাতাল এলাকায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে হাসপাতাল কম্পাউন্ডকে অগ্নিনিরাপদ বা ‘ফায়ার প্রটেক্ট হসপিটাল’ হিসেবে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যন্ত্রগুলো স্থাপনের পর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনির জানান, গত ৬৪ বছরে এই হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপণের কোনো নির্দিষ্ট খাত ছিল না। তারা প্রথমে যে বাজেট দিয়েছিলেন তা না পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে টাকা বরাদ্দ মিলেছে। ফায়ার সার্ভিসের সাথে সভা করে কোথায় কীভাবে যন্ত্রগুলো লাগানো হবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে সবগুলো যন্ত্র স্থাপন সম্পন্ন হবে এবং কিছু যন্ত্র জরুরি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনে মজুদ রাখা হবে।
পরিচালক আরও জানান, হাসপাতালে ১০ থেকে ১২টি নতুন খাত তৈরি করা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও হাসপাতালের ফোমগুলো বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ফোম পেট্রোল বা ডিজেলের চেয়েও বেশি দাহ্য। সর্বশেষ অগ্নিকাণ্ডটি বারান্দায় ঘটলেও ধোঁয়ার আতঙ্ক মানুষকে বেশি বিপদে ফেলে দেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৩৬টি ওয়ার্ডের ৫২টি ইউনিট নিয়ে এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার রোগী থাকার কথা থাকলেও রোগী ও স্বজন মিলিয়ে কমপক্ষে তিন হাজার মানুষ অবস্থান করেন। আউটডোরে প্রতিদিন আরও পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশাল এই হাসপাতালে অন্তত পাঁচ হাজার বৈদ্যুতিক পয়েন্ট রয়েছে। তাই কেবল যন্ত্র স্থাপন করেই ক্ষান্ত থাকতে চায় না কর্তৃপক্ষ, বরং সবাইকে পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষিত করতে চায় তারা।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এ কে এম নাজমুল হাসান বলেন, যেহেতু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলো হাতে পাওয়া গেছে, তাই এখন কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাথে সভাও হয়েছে। প্রশিক্ষণের পর কীভাবে যন্ত্রগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিশ্চিত করতে একটি মহড়ার আয়োজন করা হবে। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর যন্ত্রগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন হাসপাতালের সাধারণ কর্মীরা। পুরো হাসপাতাল এলাকাকে ৪৫০টি ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগে একটি করে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন করা হচ্ছে। কর্মীরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের দাবি জানিয়ে বলেছেন, সবাই দক্ষ থাকলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে।
হাসপাতালের স্টাফ সুজন জানান, পেছনের মাল্টিপারপাস ভবনসহ পুরো এলাকাকে ৪৫০টি স্পটে ভাগ করে যন্ত্রগুলো বসানো হচ্ছে। তবে এখনো প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় তারা কিছুটা চিন্তিত। প্রশিক্ষণ পেলে যেকোনো অগ্নিকাণ্ডে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন এবং আগুন ছড়ানো রোধ করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
হাসপাতালের অন্য একজন কর্মী নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সাম্প্রতিক এক অগ্নিকাণ্ডে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তখন পর্যাপ্ত যন্ত্র থাকলেও সেগুলো সঠিকভাবে চালাতে না পারায় তিনি আহত হন। তার আঙুল পুড়ে যায় এবং শ্বাসনালীতে সমস্যা হয়। নতুন এই উদ্যোগে তারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। ভবিষ্যতে সাময়িক ব্যবস্থা নিতে পারবেন বলেও তিনি মনে করেন।
মিলন নামের আরেকজন কর্মী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ডেন্টাল ইউনিটে থাকা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে যা কোনো কাজে আসছিল না। তিনি দাবি জানান যেন প্রতিটি যন্ত্র নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। বিশেষ করে নার্সিং কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত যাতে আগুন লাগলে সবাই দ্রুত এগিয়ে আসতে পারেন।
উল্লেখ্য, গত দুই বছরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার অন্তত ৯টি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৬টি অগ্নিকাণ্ড ছিল বেশ গুরুতর। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর এই বরাদ্দের ফলে হাসপাতালের সামগ্রিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


