বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) আওতায় সরকার যে দামে বিদ্যুৎ কিনছে, তা না কমালে সারা দেশে বিদ্যুতের দাম গড়ে ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি)। কমিটির মতে, বিদ্যুৎ খাত এখন রাষ্ট্রের জন্য টেকসই নয় এমন আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি সরকারের কাছে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে এনআরসি জানায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বর্তমানে বছরে ৫০ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা লোকসান গুনছে, যা প্রায় ৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারের সমান।
এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে বছরে ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যার পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। দুই হিসাব মিলিয়ে বিপিডিবিকে কেবল টিকে থাকতেই প্রতিবছর নিজস্ব আয়ের বাইরে আরও চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার জোগাড় করতে হচ্ছে।
এনআরসির মতে, দেশে হঠাৎ করে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়েনি, কাজেই এই আর্থিক চাপের পেছনে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রভাব কম। বরং গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং চুক্তিগুলো কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে, তার ফলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দেশের ভেতরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণের বেশি বেড়েছে। এতে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ঘাটতি দূর হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সুবিধা প্রায় সার্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এনআরসির দাবি, বাস্তবসম্মত চাহিদা, জ্বালানি প্রাপ্যতা ও গ্রিড সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় না করেই এই সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে সামগ্রিক ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার বছরের পর বছর ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যেই আটকে রয়েছে।
২০২৪ অর্থবছরে প্রয়োজনীয় চাহিদা ও সংরক্ষিত রিজার্ভ ধরার পরও দেশের স্থাপিত সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় পাঁচ হাজার ৬০০ থেকে ছয় হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বেশি ছিল। অত্যন্ত রক্ষণশীল হিসাবেও অন্তত তিন হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অতিরিক্ত রয়ে গেছে। এর বাইরে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ও গ্রিড সীমাবদ্ধতার কারণে আরও দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা কার্যত ব্যবহারযোগ্য নয়।
সব মিলিয়ে দেশে অলস বা অব্যবহৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত হাজার ৭০০ থেকে নয় হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে।
এনআরসি বলেছে, এই অব্যবহৃত সক্ষমতার পেছনেও উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যমান অধিকাংশ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় বিপিডিবিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। শুধু এই ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদই বছরে প্রায় ০ দশমিক ৯ থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এ ছাড়াও রয়েছে জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা সমন্বয়, বিলম্ব সুদ ও অন্যান্য দায়।
এই চুক্তি কাঠামোর কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় উৎপাদকদের পরিশোধ অনেক দ্রুত হারে বেড়েছে। ২০১১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের দেওয়া অর্থ বেড়েছে ১১ গুণের বেশি, অথচ একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। এই সময়ে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট প্রায় ২০ গুণ বেড়ে উৎপাদকদের মোট পরিশোধের প্রধান অংশে পরিণত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুতের দামে।
বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রতি ইউনিট ১২ দশমিক ৩৫ টাকা, যেখানে গড় পাইকারি দর মাত্র ৬ দশমিক ৬৩ টাকা। বর্তমান ব্যয় কাঠামোয় বিপিডিবিকে ভারসাম্যে আনতে হলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছে এনআরসি, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।
সম্পূর্ণ ব্যয় আদায় করা হলে বাংলাদেশের শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম ভিয়েতনাম, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বেশি হবে বলে সতর্ক করেছে কমিটি। এতে শিল্প প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শিল্পখাত সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এনআরসি বলেছে, এই পরিস্থিতির মূল কারণ হলো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও যথাযথ যাচাই ছাড়াই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি দেওয়া। অনেক চুক্তিতে উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক ক্যাপাসিটি চার্জ এবং জ্বালানি, মুদ্রা ও ব্যবহার ঝুঁকি পুরোপুরি বিপিডিবির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘এগুলো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়। বরং এসব সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্যে পদ্ধতিগত যোগসাজশেরই ইঙ্গিত দেয়, যার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ও অতিমূল্য চুক্তি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।’
বেঞ্চমার্ক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে চুক্তিমূল্য যৌক্তিক দরের চেয়ে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি, এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি এবং প্রতিযোগিতা ছাড়া অনুমোদিত গ্যাসভিত্তিক প্রকল্পে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ভারতের আদানি গড্ডা থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে চার থেকে পাঁচ সেন্ট অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া হচ্ছে, যা ন্যায্য দরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
এনআরসি বলেছে, ২০১০ সালে প্রণীত দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধির বিশেষ বিধান আইনের অধীনে এই চুক্তি কাঠামো কার্যকর করা আরও সহজ হয়েছে। এ বিধান জরুরি আইন হিসেবে প্রণয়ন হলেও ১৪ বছরের বেশি সময় কার্যকর ছিল। এই আইন প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া, বিচারিক পর্যালোচনা সীমিত করা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি দুর্বল করে দেয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে আইনটি বাতিল করা প্রয়োজনীয় হলেও তা যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছে কমিটি, কারণ ওই আইনের আওতায় স্বাক্ষরিত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো এখনো কার্যকর এবং সরকারি অর্থব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এই সংকট এড়াতে এনআরসি সব বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও পরিশোধের তথ্য প্রকাশ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক করা, ভবিষ্যৎ চুক্তিতে ঝুঁকি বণ্টনের ভারসাম্য আনা, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং সংসদের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি স্বাধীন এনার্জি ওভারসাইট কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে।
এছাড়া দুর্নীতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেলে চুক্তি বাতিল এবং বাকি সব চুক্তির দাম ও শর্ত পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে বাজারদরের কাছাকাছি আনার কথাও বলেছে কমিটি। বিদ্যুৎ খাত, ভোক্তা ও শিল্প রক্ষায় এটি অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ বলে জানিয়েছে এনআরসি।
তবে ৮৬ শতাংশ বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি এনআরসি কমিটির নীতিগত সুপারিশ নয়। এটি বিদ্যমান ব্যয় ও চুক্তি কাঠামোর গাণিতিক ফল, যা খাতটির গভীর সংকট ও দুর্নীতির মাত্রা বোঝাতে তুলে ধরা হয়েছে।


