বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় চাকরিচ্যুত করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে টানা সাত দিন অনশন করেছেন প্রতিষ্ঠানের দুই সাবেক কর্মকর্তা।
গত ২৫ এপ্রিল দুপুর ২টায় শুরু হওয়া এই কর্মসূচি গত শনিবার সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। অনশনকারীরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
অনশন করা দুই কর্মকর্তা হলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্পের সাবেক সহকারী পরিচালক তৌকির আহমেদ ও সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ এরফানুল হক।
এরফানুল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি। দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
তার অভিযোগ, প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এই প্রকল্পে কাজ করছেন এবং অনেক সহকর্মী ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও নীতিগত বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরপরই তাদের অমানবিক ও অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
এরফানুল হকের দাবি, অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্পের ১৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৬৫ থেকে ৭০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেতন পরিশোধ করা হয়নি এবং সরকারের কাছ থেকে উত্তোলিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া, পাঠকদের সদস্যপদ বাতিলের জমা টাকা ফেরত না দিয়ে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যাংকে স্থায়ী এফডিআর করে রাখা হয়েছে।
গত এক বছরে যারা সদস্যপদ বাতিল করেছেন, তাদের কাউকেই জমার টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘অসত্য ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে। কেন্দ্রের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্থায়ী নয় বরং চুক্তিভিত্তিক ছিলেন। নিয়োগের শর্তানুসারে যথাসময়ে তাদের চাকরির অবসান হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসে সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধিত কার্যক্রম শুরু হলে নিয়ম অনুযায়ী নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেখানে পূর্ববর্তী প্রকল্পের কর্মীদের মধ্য থেকে মেধার ভিত্তিতে ৬৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও এরফানুল হক কোনো আবেদন না করায় তাকে আর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ, তিনি ‘চাকরিচ্যুত’ হননি, বরং আবেদনের অভাবেই তার চাকরির অবসান হয়েছে।
অনশনরত অবস্থায় এক সংবাদ সম্মেলনে এরফানুল হক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পে নানা অনিয়ম হয়ে আসছে। নিয়মিত বই ক্রয় ও পাঠকসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা না হওয়ায় প্রান্তিক পাঠকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।’
দাবি আদায়ের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি জানান, তার ৩ বছরের কন্যাসন্তান খাবারের জন্য কান্না করলেও তার মা তাকে খাবার দিতে পারছেন না।
বিপরীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দাবি করেছে, চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছু কর্মী নিজস্ব অর্থায়নে কার্যক্রম চালিয়ে চাকরি বজায় রাখার দাবি তুলেছিলেন, যা ছিল ‘অবাস্তব’। এ নিয়ে ২০২৫ সালের ৫ মে আন্দোলনকারীরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে কেন্দ্র ভবন ঘেরাও, ভাঙচুর ও পরিচালককে অবরুদ্ধ করেন। এই ‘সহিংস’ ঘটনার প্রেক্ষিতে শাহবাগ থানায় একটি অভিযোগ করা হয়েছে, যেখানে বর্তমান অনশনকারীরাও অভিযুক্ত।
প্রকল্পের যুগ্ম পরিচালক জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটি বাধার মুখে পড়লেও পরে পুনরায় কার্যক্রম চালু করা হয়।
তবে কেন্দ্র স্পষ্ট করেছে, প্রকল্পের নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী সকল কর্মীর বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে এবং পাঠকদের জমার টাকা ভ্রাম্যমাণ গাড়ি থেকেই ফেরত দেওয়া হয়।


