সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে শনিবার মধ্যরাতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডাকসু সম্পাদকের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী এবং জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের কর্মীরা গভীর রাতে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করেছেন।
যে ভিডিও নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘটনাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন সড়কে ধারণ করা। ভিডিওর পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশনের নামফলক স্পষ্ট দেখা যায়।
এতে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের ছাত্রদলের সদস্য সাঈদ হাসান সাদ হাতুড়ি দিয়ে ভ্রাম্যমাণ একটি দোকান ভাঙার উদ্দেশ্যে পরপর আটবার আঘাত করেন। এরপর সাদের বন্ধু আবিদ আবদুল্লাহকে মোবাইলফোনে কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে সাদ হাতুড়িটি কালো শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন। পরে ওই ব্যক্তিও ভ্রাম্যমাণ দোকানটির চাকা ও বডিতে কয়েকবার আঘাত করেন।
এই ভিডিও থেকে ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগ আনেন ডাকসু নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে অভিযুক্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতারা দাবি করেন, ভিডিওটি শনিবার রাতে ভাইরাল হলেও ঘটনাটি গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাতের।
তারা একই সময়ের আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের উচ্ছেদ অভিযানে সহযোগিতা করতেই তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন প্রক্টরিয়াল সদস্য দোকান ভাঙছেন এবং অভিযুক্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা সেখানে তাদের পাশে উপস্থিত আছেন।
অভিযুক্ত সাঈদ হাসান সাদ বলেন, ‘আমার এবং আমার বন্ধু আবিদ আব্দুল্লাহর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশের হাকিম চত্বরে একটি ভাজাপোড়ার দোকান ছিল, যেটা সর্বমিত্র চাকমা উচ্ছেদ অভিযানের সময় তুলে দেন।’
দোকানটি পরিচালনাকারী ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গিয়ে একাধিকবার মারধর করা হয় বলেও দাবি করেন সাদ। তিনি বলেন, ‘গত ২৭ ডিসেম্বর আমাদের দোকান তুলে দেওয়ার পরও টিএসসির পাশে কেন একটি মাত্র ভাজাপোড়ার দোকান চালু আছে, তা জানতে সেখানে যাই এবং বিষয়টি প্রক্টরিয়াল টিমকে জানিয়ে তাদের সহযোগিতা করি। এখানে চাঁদাবাজির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
বিপরীতে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা দাবি করেন, দোকানটির বিষয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর পরেই সেটি ভাঙা হয়েছে।
এদিকে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদের নেতৃত্বে শনিবার রাত ১টার দিকে বিক্ষোভ করেন একদল শিক্ষার্থী। বিক্ষোভ সমাবেশে মোসাদ্দেক বলেন, ‘আজকে যেই চাঁদাবাজি ধরা পড়েছে তা ছোট একটা উদাহরণ মাত্র, এরকম হাজার হাজার উদাহরণ প্রতিদিন ঘটে। এই চাঁদাবাজরা টিএসসিতে চাঁদাবাজি করে, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে নিউমার্কেট বানিয়ে চাঁদাবাজি করে, নীলক্ষেতে চাঁদাবাজি করে এবং মেট্রো স্টেশনের নিচে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করে।’
ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মোসাদ্দেক বলেন, ‘যদি আপনারা দলীয়ভাবে সেই ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে আমরা মনে করব, এই চাঁদাবাজির সঙ্গে সমগ্র ছাত্রদল দলীয়ভাবে জড়িত এবং দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানও এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।’
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারি (এবি জুবায়ের) রবিবার দুপুর ১২টায় ডাকসু ভবনের সামনে প্রমাণসহ সংবাদ সম্মেলন করার কথা জানান।
ডাকসু নেতাদের এই সমাবেশ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ ছাত্রশক্তি একটি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। এতে ছাত্রদলের হল সংসদের নেতাকর্মীরাও যোগ দেন।

বিক্ষোভ সমাবেশে ফজলুল হক মুসলিম হলের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফেরদৌস আইয়াম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সিগারেট নিষিদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু ডাকসু নেতারা কনসার্টে স্পন্সরের মাধ্যমে সিগারেট বিতরণ করছে। আমরা এখানে কাউকে “শেল্টার” দেওয়ার জন্য দাঁড়াইনি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
‘ক্যাম্পাসে শত শত হকার ব্যবসা করতে পারলে শিক্ষার্থীরা ব্যবসা করলে, তা কেন ভাঙচুর করা হবে’ প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ সময় শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে ভীতিহীন পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিতের দাবিও জানান ফেরদৌস আইয়াম।
শহীদুল্লাহ হল সংসদের সদস্য রিয়াদ উস সালেহীন বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আপনি (সর্বমিত্র) এমন একটা পরিচয়ের দিকে নিয়ে গেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন নাকি মব করে। আপনি যা করেন তার মানে শিক্ষার্থীরাও তাই করে, কারণ আপনি শিক্ষার্থীদের তথাকথিত প্রতিনিধি। আরও মজার বিষয়, এসবের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে তাদের চাঁদাবাজ ট্যাগ দেওয়া হয়।’
আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান বলেন, ‘ডাকসুর ব্যানারের অপব্যবহার করে কিছু মবস্টারদের উত্থান ঘটেছে, যারা ক্যাম্পাসে বিভিন্ন মোরাল পুলিশিং করে বেড়ায়। মবস্টার পরিচয়ে বিভিন্ন অপকর্মও করে বেড়ায়। সর্বমিত্র চাকমা তাদের মধ্যে অন্যতম।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফউদ্দিন আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। প্রাথমিকভাবে প্রক্টরিয়াল বডির কাছে কোনো লিখিত অভিযোগও জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভ্রাম্যমাণ দোকান ভাঙচুরের ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত ভিডিওটি পর্যালোচনা করা হবে।’
ডকসুর সংবাদ সম্মেলনের বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল রবিবার সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে এই ঘটনার প্রতিবাদে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এরপর দুপুর ২টায় ‘সর্বমিত্র চাকমা কর্তৃক মিথ্যা চাঁদাবাজির অভিযোগ ও অপপ্রচারের প্রতিবাদে আইনি পদক্ষেপ ও সংবাদ সম্মেলন’-এর ঘোষণা দিয়েছে।


