তানভীর মোকাম্মেল শুধু নিজে চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, তার হাত ধরে এ দেশে বহু নির্মাতা তৈরি হয়েছে। ১৯৫৫ সালের ৮ মার্চ খুলনায় জন্মগ্রহণ করে তিনি। সেখানকার ‘মোকাম্মেল মঞ্জিল’-এ তার বেড়ে ওঠা। শিক্ষিত ও প্রগতিশীল এক পরিবারে জন্ম নেওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে মানবিকতা ও সংবেদনশীলতার বীজ বপিত হয়। তার পিতা এ এফ এম মোকাম্মেল ছিলেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং মাতা বেগম সাইয়েদা মোকাম্মেল ছিলেন কলেজের অধ্যাপিকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনার সময় তিনি বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির সাপ্তাহিক ‘একতা’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন এবং ভূমিহীন কৃষকদের পক্ষে গ্রামে কাজ করেন। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি সিনে সার্কেল’ প্রতিষ্ঠা করেন। মায়ের দেওয়া দশ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হয় তার চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা। সেই পথ ধরেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা।
তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্রে বারবার উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, প্রান্তিক মানুষের জীবন, নারীর অধিকার, সামাজিক অবিচার এবং মানবিকতার গভীর দার্শনিক প্রশ্ন। তার মতে, ‘শিল্পীর কাজ হলো নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা।‘ নির্মলেন্দু গুণের কবিতা অবলম্বনে ১৯৯১ সালে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘হুলিয়া’ তার প্রথম উল্লেখযোগ্য কাজ। একই বছর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘স্মৃতি একাত্তর’-এ উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের করুণ ইতিহাস।
১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নদীর নাম মধুমতী’ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ বাংলার জীবনকে গভীরভাবে তুলে ধরে। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চিত্রা নদীর পারে’ দেশভাগের যন্ত্রণা ও মানুষের বাস্তুচ্যুতির গল্প উঠে আসে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস অবলম্বনে ২০০১ সালে মুক্তি প্রাপ্ত ‘লালসালু’ ধর্মীয় কুসংস্কার ও গ্রামীণ সমাজের অন্ধবিশ্বাসকে শক্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি মোট দশ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
২০০৪ সালে নির্মিত ‘লালন’ চলচ্চিত্রটি ফকির লালন শাহের জীবন ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও মানবতাবাদের বার্তা উঠে আসে। ‘জীবনঢুলী’ (২০০৬), ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ (২০১৯)সহ অন্যান্য চলচ্চিত্রে তিনি নারীর সংগ্রাম, নদীমাতৃক বাংলার জীবন এবং সমাজের পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরেছেন। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য— ‘১৯৭১’, ‘সীমান্তরেখা’, ‘কর্ণফুলীর কান্না’, ‘স্বপ্নভূমি’সহ তার প্রামাণ্যচিত্রগুলো ইতিহাস, পরিচয় ও মানুষের বেদনার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সাবেক সভাপতি ছিলেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও নাটকও লিখেছেন, যা পাঠকমহলে প্রশংসিত।
বর্তমানে তিনি পল্লীকবি জসীমউদদীন আহমদের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। গোপালগঞ্জের চান্দার বিল অঞ্চলে ছবিটার শুটিং হয়েছে। এ পর্যন্ত ছবিটার ষাট ভাগ শুটিং সমাপ্ত হয়েছে।
তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্রে বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে শিল্পের সত্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতাই বেশি গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার চলচ্চিত্র প্রশংসিত হয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নিরীক্ষাধর্মী ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণের যে ধারা গড়ে উঠেছে, তিনি তার অন্যতম পথিকৃৎ। তার চলচ্চিত্র প্রমাণ করে—চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়; এটি ইতিহাসের সাক্ষ্য, সমাজের দর্পণ এবং মানবিকতার এক গভীর আহ্বান।


