ইরানের ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। শুধু তাই নয়, দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ কার্যকর রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা মার্কিন বাহিনীর রয়েছে। এই অবরোধ এরইমধ্যে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।
পানামা সফরের সময় সাংবাদিকদের হেগসেথ বলেন, ‘অনির্দিষ্টকাল যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এ ধরনের অবরোধ বজায় রাখতে পারে। কারণ আমরা জাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে মোতায়েন রাখব, যেভাবে করে আসছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাব।’
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরানের ওপর আরও বড় ধরনের আর্থিক চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সের ‘রব স্মিথ টুনাইট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে আরও ঘোষণা আসছে। আমরা এমন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি, যা কোনো দেশের বিরুদ্ধে ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি এমন অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার নজির তৈরি করবে।’
যুদ্ধ বন্ধে গত জুনে ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে হওয়া সম্ভাব্য একটি সমঝোতা কার্যত ভেস্তে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ইরান এই পথে চলাচলকারী কয়েকটি জাহাজে হামলাও চালিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াম। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার এটিকে ইরানের হামলা হিসেবে নিন্দা করেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে গত মঙ্গলবার জাহাজ চলাচল কমে মাত্র আটটিতে নেমে এসেছে। গত ১০ দিনে গড়ে কেবল ১২টি জাহাজ এই পথে চলাচল করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভ্যন্তরীণভাবে যুদ্ধ বন্ধের চাপের মুখে রয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দেশটির জনগণের মধ্যে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জ্বালানির উচ্চ মূল্য ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ট্রাম্প অবশ্য বারবার বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। তবে তেহরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরান জানিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই নৌপথ পুনরায় স্বাভাবিক হতে দেওয়া হবে না।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে রাখা দেশটির সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া।
জুনের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র এক মাসের জন্য ইরানের জাহাজ চলাচল ও বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নিয়েছিল। পরে আবার তা কার্যকরের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। এর ফলে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যায় এবং যুদ্ধের কারণে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতির প্রভাব আরও বেড়েছে।
এর আগে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছালে অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে তিনি অর্থনৈতিক চাপের পথেই বেশি নির্ভর করতে চান।


