বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ। এ দেশের মানচিত্র দেখলে মনে হবে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় নদী। একসময় এই নদী পথই ছিল ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। ফলে নদী কেন্দ্রীক বড় বড় জনপদ গড়ে উঠতে দেখেছি আমরা। আবার এই সব প্রমত্তা নদ-নদীগুলো ভরা বর্ষায় তার কঠোর রূপ ধারণ করে। নদী ভাঙন থেকে সৃষ্টি হয় উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর। অন্যদিকে এই নদীই আবার সৃষ্টি করে ছোট বড় নানা রকম চর। যেখানে বসবাস করছে প্রায় এক কোটি মানুষ।
২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হচ্ছে, তখন মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে চরাঞ্চলের যে জীবনযাত্রার ব্যবধান, তা আমাদের রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সমবণ্টন ও ন্যায়বিচারের ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে আমরা লক্ষ্য করেছি, বাজেটে এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো বিশেষ বরাদ্দ থাকে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন দর্শনে ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ স্লোগানটি গুরুত্ব পেলেও বাজেটের বিশাল অঙ্কের টাকা বরাদ্দের ক্ষেত্রে চরাঞ্চলগুলো বরাবরের মতোই বঞ্চিত থেকে গেছে।
এর আগে, ২০২২ সালেই বাংলাদেশ ‘শতভাগ বিদ্যুতায়নের’ মাইলফলক স্পর্শ করেছে বলে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। রাজধানীর আলোকসজ্জা কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোর রাতের উজ্জ্বলতা সেই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা আর পদ্মার চরাঞ্চলগুলোতে গেলে এই দাবির সারবত্তা নিয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ভৌগোলিক দুর্গমতার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর চরের মানুষগুলোকে জাতীয় গ্রিডের বাইরে রাখা হয়েছে। সোলার প্যানেল দিয়ে কোনোমতে একটি বাতি জ্বললেও তা দিয়ে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প বা সেচ পাম্প চালানো সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য সেবার কথা ন বললে নয়। দেশের সামগ্রিক চিন্তায় স্বাস্থ্য সেবার মান হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নত হয়েছে। কিন্তু সেই উন্নয়ন চরাঞ্চলের মানুষের জন্য ঠিক খাটে না। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা যেন এক অলীক কল্পনা। চরের বৈষম্য সবচেয়ে নির্মমভাবে ধরা পড়ে একজন প্রসূতি মায়ের যন্ত্রণায়। বর্ষায় উত্তাল নদী আর শুষ্ক মৌসুমে ধূ ধূ বালুচর পাড়ি দিয়ে কোনো উন্নত হাসপাতালে পৌঁছানো চরের মানুষের জন্য এক মরণপণ লড়াই। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অবকাঠামো থাকলেও চরাঞ্চলের জন্য বিশেষায়িত কোনো ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল বা স্পিডবোট অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
এ তো গেল স্বাস্থ্য সেবার কথা, শিক্ষার আলাপে যদি আসি তাহলে তার অবস্থা আরো করুণ। একটি জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষা, কিন্তু চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য সেই মেরুদণ্ড শুরুতেই ভেঙে পড়ছে। নদী ভাঙনের ফলে প্রতিবছর শত শত বিদ্যালয় বিলীন হয়ে যায়। শিক্ষকদের চরে যাতায়াতের ন্যূনতম ভাতা বা আবাসন সুবিধা না থাকায় মানসম্মত শিক্ষক সেখানে টেকে না।
চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি ও পশুপালন। আমরা যে খাদ্যশস্যের উদ্বৃত্তের গল্প বলি, তার একটি বড় অংশ আসে চরের মানুষের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম থেকে। অথচ চরের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তারা সার, বীজ বা কীটনাশক পান চড়া দামে, কিন্তু উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সময় উপযুক্ত বাজার পান না। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে চরের কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
চরাঞ্চলের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির শিকার। নদী ভাঙন আর আকস্মিক বন্যা তাদের নিত্যসঙ্গী। প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার নদী ভাঙনের ফলে নিঃস্ব হয়ে মূল ভূখণ্ডের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ‘ত্রাণ’ বিতরণ করা হলেও তা সাময়িক উপশম মাত্র। চরাঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য যে ধরনের স্থায়ী বাঁধ বা ড্রেজিং প্রয়োজন, মেগা প্রজেক্টের ভিড়ে সেই পরিকল্পনাগুলো সবসময়ই পেছনের সারিতে থাকে।
উপসংহার ও উত্তরণের পথ
উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের প্রান্তিক মানুষকে স্পর্শ করে। ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের উন্নয়নের মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। কেবল ঢাকাকে আধুনিক করা বা মেগা প্রজেক্ট দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য বিচার করা ভুল হবে। চরাঞ্চলের বঞ্চনা দূর করতে হলে প্রয়োজন–
বিশেষায়িত চর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ: চরাঞ্চলের জন্য আলাদা বাজেট ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
সঞ্চালন ও যোগাযোগ: চরাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে ফেরি সার্ভিস বা শক্তিশালী নৌ-নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
মোবাইল হাসপাতাল: চরের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও ঔষধসহ স্পিডবোট, অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তির বিস্তার: চরাঞ্চলে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা বিশেষ নেটওয়ার্ক টাওয়ার স্থাপন করে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়া।
পরিশেষে, চরাঞ্চলের এক কোটি মানুষ কেবল একটি ভোটার সংখ্যা নয়; তারা এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন যাত্রাকে সত্যিকারের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ করতে হলে চরের এই হাহাকার শুনতে হবে। উন্নয়নের সুষম বণ্টন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে চরাঞ্চলের এই বঞ্চনা আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির অহংকারকে একদিন ম্লান করে দেবে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানচিত্রের শেষ প্রান্তের মানুষটিও গর্ব করে বলতে পারবে—এই রাষ্ট্রের উন্নয়নে আমারও হিস্যা আছে।


