মাত্র তিনটি অ্যাম্বুলেন্স, ছয়জন চালক ও ১০ জন চিকিৎসক নিয়ে চলছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসা কার্যক্রম। ফলে জরুরি প্রয়োজনে সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এমনকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত অ্যাম্বুলেন্স।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার শিক্ষার্থী আবাসিক হল এবং ক্যাম্পাসের আশপাশে অবস্থান করেন। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর চিকিৎসা সেবার প্রধান ভরসা চবি মেডিকেল সেন্টার। তবে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, চালক ও চিকিৎসক না থাকায় জরুরি সময়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জরুরি প্রয়োজনে মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স সেবা পেতে প্রায়ই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না, কিংবা এর অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্যও দেওয়া হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে বিকল্প উপায়ে রোগীদের স্থানান্তর করতে হয়। এ ছাড়া, মেডিকেলে উন্নত চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের ২২ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) পাঠাতে হয়। তবে জরুরি রোগী পরিবহনের দায়িত্বে থাকা অ্যাম্বুলেন্সগুলোর কিছু সময় চিকিৎসকদের আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ।
দর্শন বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া সরকার বলেন, ‘মেডিকেলের ডাক্তাররা ডিউটিতে আসা-যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেন। একবার আমার এক বন্ধু অসুস্থ হলে পরীক্ষার মাঝখানে তাকে মেডিকেলে নিয়ে যাই। চিকিৎসা শেষে ফেরার সময় দেখি অ্যাম্বুলেন্স নেই। পরে জানতে পারি, সেটি ডাক্তারকে নিয়ে গেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, মাঝেমধ্যে অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহার করা হয়।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. তরিকুল ইসলাম তারেক জানান, জ্বরে অসুস্থ হয়ে দুপুরে মেডিকেলে ফোন করলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১২টা ৫৯ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন দিই। বলা হয়, দুটি অ্যাম্বুলেন্স শহরে আছে, অন্যটির অবস্থান জানা নেই। এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স পাইনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহায়তা চাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। শেষ পর্যন্ত বিকাল ৪টা ৫১ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স আসে।’
অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা জানান বাংলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ঐশী রায়। তিনি বলেন, ‘রাতে জরুরি অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করলে জানানো হয়, দুটি অ্যাম্বুলেন্সই শহরে গেছে। পরে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সেবা পাইনি। পরদিন সকালেও আসতে দেরি করায় বাধ্য হয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শহীদ মিনারের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের দেখা পাই।’
এমনকি হলের জরুরি পরিস্থিতি সামলাতেও দেরি হওয়ার ঘটনা ঘটছে। নবাব ফয়জুন্নেসা হলের সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘এক রাতে হলের এক শিক্ষার্থীর গলায় খাবার আটকে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকবার কল দেওয়ার পর প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরে অ্যাম্বুলেন্স আসে। এই সময়ের মধ্যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।’
মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, এখানে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ফিজিওথেরাপি, ইসিজি, ল্যাব ও বিভিন্ন ওষুধ রয়েছে।
রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব সেবা খাত থেকে মোট ১৪ লাখ ৫৯ হাজার ২৮০ টাকা আয় হয়েছে। এর মধ্যে প্যাথলজি খাত থেকে ১০ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ফিজিওথেরাপি থেকে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯, মেডিসিন থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ৩১১, আল্ট্রাসনোগ্রাফি থেকে ৭৭ হাজার ২২০, ইসিজি থেকে ১৬ হাজার ৪৮০ এবং অক্সিজেন সেবা থেকে ১৫ হাজার ৭০০ টাকা অর্জিত হয়েছে।
কিন্তু সেবার এই আয় সত্ত্বেও চরম জনবল সংকটে ভুগছে কেন্দ্রটি। শিক্ষার্থীদের সেবা দিতে বর্তমানে ১০ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন, যা আগে ছিল ১৪ জন। বর্তমানে কর্মরত ১০ জনের মধ্যে তিনজন ছুটিতে থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার জন্য রয়েছেন মাত্র ছয়জন চালক। ফলে ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে চবি মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক আবু তৈয়ব বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সে করে ডাক্তারদের আনা-নেওয়ার বিষয়টি সিন্ডিকেট অনুমোদিত। শুরু থেকে এ বিষয়ে অনুমোদন রয়েছে।’
সেবায় বিলম্ব হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘সেবায় দেরি হওয়ার মূল কারণ ডাক্তার ও চালক সংকট। আগে ১৪ জন ডাক্তার ছিলেন, এখন আছেন মাত্র ১০ জন। তাদের মধ্যে তিনজন ছুটিতে থাকায় সংকট বেড়েছে। দ্রুত ডাক্তার নিয়োগের জন্য সিন্ডিকেটে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।’
চালক ও জনবল সংকট নিয়ে তিনি আরও জানান, তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ছয়জন চালক দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া কঠিন। কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘাটতির এই বিষয়গুলোও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।


