চট্টগ্রামে শিশুদের মধ্যে হামের ভয়াবহ প্রকোপে হাসপাতালগুলো চাপের মুখে। এর মধ্যেই নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে ডেঙ্গু। জুনে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরে বিভিন্ন ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে।
শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ওয়ার্ডগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হামের প্রকোপ বাড়ায় গত মে মাস থেকে চমেক হাসপাতালের পুরোনো ডেঙ্গু ওয়ার্ডটিকে ‘মিজলস ব্লক’ বা হাম ব্লকে রূপান্তর করা হয়। এতে চমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কোনো ওয়ার্ড অবশিষ্ট নেই। সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই লড়তে হচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্তদের। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। জানুয়ারি মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৮ জন। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ২২ জনে দাঁড়ায়, মৃত্যু হয় ১ জনের। মার্চ মাসে ২০ জন ও এপ্রিলে ২৯ জন আক্রান্ত হলেও মে মাসে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ জনে। জুন মাসে এসে ডেঙ্গু আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। আজ ২৬ জুন পর্যন্ত কেবল এই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৮৮ জন। বছরের প্রথম পাঁচ মাস পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল মনে হলেও জুনের এই লাফ বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বর্তমানে চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২৬৪ জন, যার মধ্যে ১৬৭ জনই চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার। উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ২২ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
ডেঙ্গুর সমান্তরালে হামের প্রকোপ এখন রীতিমতো ভয়াবহ। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২৬ জুনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৬ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৯৬ জন। তাদের মধ্যে ২৫৫ জনই মহানগর এলাকার শিশু। গত কয়েক মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ৩ হাজার ২৭০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও আক্রান্তের হার কমছে না। চট্টগ্রামের ৮টি এলাকাকে হামের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মহানগর এলাকা ও সীতাকুণ্ড অন্যতম।
শনিবার বিকালে চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা গেছে। হাসপাতালের পিআইসিইউতে জায়গা নেই। চিকিৎসকদের তথ্যমতে, পিআইসিইউতে আসন রয়েছে ১৫টি। বর্তমানে ১৫ জন শিশুই হামের কারণে সেখানে ভর্তি। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোহিঙ্গা শিশু সেখানে ভর্তি রয়েছে।
সীতাকুণ্ড থেকে আসা রং মিস্ত্রি মোহাম্মদ হৃদয় তার ৭ মাস বয়সী কন্যা রুবাইদা ইবনে মেহুকে নিয়ে ১৭ দিন ধরে হাসপাতালে আছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পাঁচ থেকে ছয় দিন ধরে পিআইসিইউর জন্য ঘুরছি। ডাক্তাররা বলেন সিট খালি নেই। বাচ্চা মারা গেলেই সিট খালি হয়, তখনই অন্য রোগী নেওয়া হয়। বার বার ঘুরেও সিট পাচ্ছি না।’
চিকিৎসা নিতে আসা অভিভাবকদের ভোগান্তি চরমে। খাগড়াছড়ি থেকে আসা আবু কাউসার বলেন, প্রথমে দালালদের খপ্পরে পড়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে লাখ টাকা খরচ করে সর্বস্বান্ত হয়ে চমেক হাসপাতালে এসেছেন। এখানেও সংকটের শেষ নেই। তিনি জানান, অক্সিজেনের এক মাস্ক একাধিক শিশুকে ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে, এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ। পরে তিনি নিজের খরচে ১০০ টাকা দিয়ে আলাদা মাস্ক কিনে এনেছেন।
বান্দরবানসহ অন্যান্য দুর্গম এলাকা থেকেও অনেক শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসছে।
চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন, ডেঙ্গু রোগী এভাবে বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব হবে। চমেক হাসপাতালে বর্তমানে ১১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন থাকলেও তাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড নেই। ডেঙ্গু রোগীদের সাধারণ ওয়ার্ডে বা হাম ব্লকের আশেপাশে রাখলে মশাবাহিত এই রোগ অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘২০২৩ সালে চট্টগ্রামে প্রায় ৯ হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল, ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ২ হাজার ৭৪৮ জনে ও মৃত্যু ১৬ জনে নেমে আসে। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হয় ২ হাজার ৬২২ জন, মৃত্যু হয় ৮ জনের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আক্রান্তের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০৯ জনে; এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এই অর্জন ধরে রাখতে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’
মেয়র আরও বলেন, ‘নগরবাসী নিজ নিজ আঙিনা ও বাসাবাড়িতে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে এককভাবে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে শতভাগ সফল হওয়া সম্ভব নয়। কোথাও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
চট্টগ্রামে হামের ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এতে চট্টগ্রামে আগের তুলনায় হাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমাম হোসেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী জানান, বর্ষার পূর্ণ মৌসুমে একদিকে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী হার, অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসাব্যবস্থা সচল করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ এবং ডেঙ্গুর জন্য পুনরায় পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা না হলে আগামী দিনে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও প্রাণহানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


