এক দশকের বেশি সময় থেমে থাকার পর চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে। সোমবার থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক এই শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এদিন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।
সংবাদ সংস্থা বাসসের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ও চীন ২০১৪ সালে এ প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। তবে ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন চূড়ান্ত করা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজ এতোদিন শুরু হয়নি। গত ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে। সফরে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ জুন বেজা ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-এর মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ডেভেলপার চুক্তি হয়।
এর আগে, গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এ অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পায়নের যে স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে লালিত হয়ে আসছিল, এবার তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। বহু প্রতীক্ষিত ‘বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল (চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন)’-এর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত সূচিত হতে যাচ্ছে ।
কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আনোয়ারা এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত শিল্প হাব হওয়ার পথে। প্রকল্পটি কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, এটি এই অঞ্চলের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার মান বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি।
প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে থাকবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন প্রমুখ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থাপনায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি সই করার পর মূল অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হবে।
কর্ণফুলী টানেল থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণ থেকে আসবে দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে এক হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, এক হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪ দশমিক ২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কেমিক্যাল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি, গার্মেন্টস, ওষুধসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে।
চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষায়িত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। তার মতে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প।


