চট্টগ্রাম নগরের নন্দনকানন এলাকায় একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির ও সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) অনুসারী এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এ ঘটনায় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই পক্ষকে নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করছে পুলিশ।
জানা গেছে, নন্দনকানন এলাকার ওই সম্পত্তির মূল মালিক ছিলেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সংগীতশিল্পী শেফালী ঘোষ। তার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে তিন সন্তানের মধ্যে ভাগ করা হয়। তাদের একজন কলকাতায় এবং আরেকজন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। অপর সন্তান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওই মৃত সন্তানের স্ত্রী ইসকনের অনুসারী হওয়ায় তার মাধ্যমে ইসকন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাড়িটিতে প্রবেশ করে সেখানে মন্দির প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করেন।
স্থানীয়দের দাবি, একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত লোকনাথ মন্দিরটির ইতিহাস প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বছরের পুরোনো। সেখানে একটি প্রাচীন প্রাসাদোপম স্থাপনাও রয়েছে। দুই মন্দিরের প্রবেশপথ একই হওয়া এবং ধর্মীয় কার্যক্রম নিয়ে মতবিরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল।
জানা গেছে, নন্দনকানন এলাকাটি অত্যন্ত পুরোনো জায়গা। যার কারণে অধিকাংশ জায়গা খাস হয়ে গেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিষয়টি সরকার তদারকি করবে বলে জানা গেছে।
নগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া জানান, কোরবানির ঈদের আগে ইসকন অনুসারীরা তার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তখন পুলিশ সরেজমিন পরিদর্শনের কথা জানিয়ে ঈদের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে শনিবার রাত ৩টার দিকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন সেখানে জড়ো হন।
এ সময় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘর্ষ চলাকালে ইসকন অনুসারীরা লোকনাথ মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় হামলা ও ভাঙচুর চালান। এতে আশপাশের কয়েকটি আবাসিক ভবনের জানালার কাচ ভেঙে যায়।
সংঘর্ষে অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রঘুনাথ মন্দিরের কর্মাধ্যক্ষ ও তার ছেলেও রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, পাথরের আঘাতে তার ছেলের চিবুক ও ঠোঁট ফেটে গেছে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সংঘর্ষের সময় মন্দিরসংলগ্ন একটি বর্ধিত অংশ, যা অ্যাঙ্গেল দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি ভেঙে ফেলা হয়। এ ছাড়া মন্দিরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও বাগানের গাছপালারও ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার পর শনিবার দুপুর ২টায় কোতোয়ালী থানায় উভয়পক্ষ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসে পুলিশ। উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা দুই পক্ষের বক্তব্য শুনেছি। জায়গাটি অনেকটা এস্টেট সম্পত্তির মতো অবস্থায় আছে। আপাতত দুইপক্ষকে সহাবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে, ভাঙা অংশে ইসকন অনুসারীরা ব্যানার টাঙিয়ে কীর্তন ও আরাধনা করছেন। পরে পুলিশ উসকানিমূলক ব্যানার সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখতে জায়গাটি আপাতত যেভাবে আছে, সেভাবেই রাখার পরামর্শ দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার। কোনো পক্ষ মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করতে চাইলে আইনিসহায়তা দেওয়া হবে। তবে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক উসকানি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পুলিশ জানায়, দীর্ঘদিনের এ বিরোধের অন্যতম কারণ মন্দিরে প্রবেশের জন্য একটি মাত্র সাধারণ গেট থাকা। পাশেই পাহাড় ও বিদ্যালয় থাকায় বিকল্প প্রবেশপথ তৈরিও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের ওপরও দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ মারামারি বা ফৌজদারি অপরাধে জড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায় পুলিশ।


