গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় ১৪ দিনে দায়ের হয়েছে ১৪টি মামলা। এসব মামলায় আসামি হিসেবে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১ হাজার ১৭৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা ১৪ হাজার ৫৬০ জনকে। পুলিশ ইতিমধ্যে ৩৩৬ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সবশেষ মামলাটি করা হয়েছে মঙ্গলবার রাতে। গোপালগঞ্জ সদর থানায় দায়ের করা এ মামলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৪১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে আরো অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করা হয়েছে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বাসভবনে হামলার ঘটনায়।
গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মো. সাজেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে সদর থানার সহকারী উপপরিদর্শক ফারুক হোসেন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করেছেন। এ নিয়ে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন থানায় মোট ১৪ টি মামলা হয়েছে।’
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্ক, লঞ্চঘাট, এস কে আলিয়া মাদ্রাসা সড়ক, কাঁচাবাজার এলাকাসহ সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে জনমনে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে যান চলাচল ব্যাহত করা হয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের পক্ষে মিছিল করা হয়। আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে ও এনসিপির সমাবেশ বানচাল করতে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পাশাপাশি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিসহ সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করার পাশাপাশি জনসাধারণের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেন। সংঘর্ষ চলাকালে একদল দুর্বৃত্ত গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসকের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গোপালগঞ্জে সহিংসতার ঘটনায় বুধবার পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় হত্যা, হামলা ও ককটেল নিক্ষেপ, পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, জেলা কারাগারে হামলা, জেলা প্রশাসকের বাসভবনে হামলা ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়ানোর অভিযোগে মোট ১৪টি মামলা হয়েছে। গোপালগঞ্জ সদর, কাশিয়ানী, টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া থানায় দায়ের করা এসব মামলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১ হাজার ১৭৫ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা ১৪ হাজার ৫৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় ইতিমধ্যে ৩৩৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গত ১৬ জুলাই এনসিপির সমাবেশ ঘিরে গোপালগঞ্জে সহিংসতায় পাঁচজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- গোপালগঞ্জের থানাপাড়া এলাকার রমজান মুন্সী (৩৫), শহরের উদয়ন রোডের বাসিন্দা সন্তোষ সাহার ছেলে দীপ্ত সাহা (২৫), সদরের ভেড়ার বাজার এলাকার ব্যাপারীপাড়ার ইমন তালুকদার (১৭), টুঙ্গিপাড়ার সোহেল রানা (৩৫) ও সদরের বিসিক এলাকার রমজান কাজী (১৮)।

গোপালগঞ্জে দফায় দফায় সহিংসতার জেরে প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পরে পরিস্থিতির অবনতির ঘটলে সেদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কারফিউ জারি করা হয়। পরদিন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রথম দফায় কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়িয়ে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত করেন। এর মধ্যে শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে তিন ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল ছিল। পরে দ্বিতীয় দফায় কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়িয়ে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত করা হয়। এরপর ১৪ ঘণ্টা শিথিল রেখে রাত ৮টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়ানো হয়। তারপর রাতে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। সব মিলিয়ে গোপালগঞ্জের জীবনযাত্রা দুই সপ্তাহেও স্বাভাবিক হয়নি, চারিদিকে থমথমে পরিবেশ।


