সেনাপ্রধান হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের সময়ে কতজন গুম হয়েছিল সেটি বলতে না পারলেও গুমের সংস্কৃতি প্রতিরোধে অসংখ্যা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বলে জানালেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গুম, খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের মামলায় তিনি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চতুর্থ দিনের মতো জেরা করা হয় ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে। জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো। তবে এদিনও জেরা অসমাপ্ত থাকায় মঙ্গলবার পরবর্তী জেরার দিন ঠিক করে দেয় আদালত।
জেরায় সাক্ষী বলেন, ‘কে বা কারা গুম হচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর (এমআই) কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তবে গুম হচ্ছে মর্মে তারা আমাকে জানিয়েছে। যারা গুম হয়েছিল, তাদের কাউকে আমি উদ্ধারের চেষ্টা করিনি। কারণ, এটা আমার দায়িত্বাধীন ছিল না এবং আমি জানতাম না, কে কখন কোথায় গুম হয়েছে।’
আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘গুমের সংস্কৃতি প্রতিরোধ করতে আমি অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এ মর্মে দালিলিক কোনো প্রমাণপত্র দাখিল করিনি। দালিলিক কোনো প্রমাণ নেই। গুম প্রতিরোধের জন্য সুপার চিফ বা প্রধানমন্ত্রী বরাবরে চিঠি পাঠাইনি বা তাকে লিখিতভাবে জানাইনি।’
একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তা র্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরার পর তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন জানালেও সেই কর্মকর্তার নাম বলদে পারেননি সাবেক সেনাপ্রধান।
তিনি বলেন, ‘কত তারিখ তিনি আমার কাছে এসেছিলেন, স্মরণ নেই। এই কনিষ্ঠ অফিসার দুজনকে হত্যা করেছেন মর্মে আমার কাছে স্বীকার করার পরিপ্রেক্ষিতে আমি তার বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিনি। এই মর্মে কোনো সাক্ষী বা আলামত ছিল না। তার এরূপ স্বীকারোক্তি আমি রেকর্ড করিনি।’
তবে ওই সেনা কর্মকর্তা প্রতিটি হত্যার জন্য পাওয়া ১০ হাজার টাকা মসজিদে দান করেছিলেন বলে জানান ইকবাল করিম।
সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি জিওসি থাকাকালীন সময়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান বিজিবির নাইক্ষংছড়ির জোন কমান্ডার ছিলেন। ১০ জনকে ক্রসফায়ারের জন্য হাসিনুর রহমানের চার বছর তিন মাসের সাজা হয়েছিলো কি না তা আমার জানা নেই। আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে তার দুই বছর তিন মাস সাজা মওকুফ করেছি। তাকে একটি মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত তিনি ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত থাকাকালে একটি মিথ্যা জঙ্গী মামলায় সাজা দেওয়া হয়। আমি সেই সাজা কমিয়ে দিয়েছিলাম।’
বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনী যুক্ত ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রকল্পে সেনা সদস্যরা কোনো দুর্নীতি করেছে কিনা তা তার জানা নেই।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত যেসকল সেনা সদস্য দুর্নীতির সাথে যুক্ত ছিলো তাদের আমি শনাক্ত করিনি। কারণ তারা আমার আওতাধীন ছিলো না। এটা সত্য নয় যে, সেনাপ্রধান হিসেবে আমি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে কতজন গুম হয়েছিলো তা বলতে পারবো না। যারা গুম হয়েছিলো তাদের কাউকে আমি উদ্ধারের চেষ্টা করি নাই। কারণ এটা আমার দায়িত্বাধীন ছিলো না এবং আমি জানতাম না কে কখন কোথায় গুম হয়েছে। কে বা কারা গুম হচ্ছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর (এমআই) কোন তথ্য দিতে পারেনি। তবে গুম হচ্ছে মর্মে তারা আমাকে জানিয়েছে।’
‘গুমের সংস্কৃতি প্রতিরোধ করতে আমি অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এ মর্মে দালিলিক কোনো প্রমাণপত্র দাখিল করিনি। দালিলিক কোনো প্রমাণ নেই। গুম প্রতিরোধের জন্য সুপার চিফ বা প্রধানমন্ত্রী বরাবরে কোনো চিঠি পাঠাইনি বা তাকে লিখিতভাবে জানাইনি।’
র্যাবে সে সব সেনা সদস্য যেতেন তারা কোনো অপরাধ করলে সেই অপরাধ সম্পর্কে আমি প্রতিবেদন পাইনি, বলেন তিনি।
আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল যখন আমাকে জানালেন যে, আসামি জিয়াউল আহসান তার বাসায় অস্ত্র রাখে, গার্ড মোতায়েন রাখে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে, তখন আমি আসামি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করিনি। ডিজিএফআইয়ের উপর সেনাপ্রধানের আংশিক প্রশাসনিক কন্ট্রোল রয়েছে।’
‘এটা সত্য নয় যে, আমি কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল থাকাকালীন সময় খালেদা জিয়াকে তার ঢাকা সেনানিবাসের বাসা হতে উচ্ছেদের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সকল কার্যক্রম গ্রহণ করি। আমি সে সময় বিদেশে ছিলাম। হাসিনা সরকারের আমলে আমি কোনো পাওয়ারপ্লান্ট পরিচালনার অনুমোদন পাইনি।’
এর আগে ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি দেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ১০৪ জনকে হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করা হয়। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের মতে, ২০০৯-২০১৬ সময়কালে জিয়াউল আহসান র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক এবং এডিজি (অপস্) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে অসংখ্য বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, অগণিত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে তার সরাসরি নির্দেশ, অনুমোদনক্রমে, জ্ঞাতসারে তার বিশ্বস্ত র্যাব সদস্যরা সংঘটন করত।
২০০৯ সালে সেনাবাহিনীর মেজর অবস্থায় র্যাবে পোস্টিং পাওয়ার পর থেকে আসামি জিয়াউল আহসান বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ফলে ২০২৪ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসরের আগ পর্যন্ত তাকে কখনোই মাতৃবাহিনী তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফেরত যেতে হয়নি।
হাসিনার পুরো আমলে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থায় কাজ করেছেন। পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কোর্স বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করে এবং কোনো ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড বা ফর্মেশন কমান্ডের অভিজ্ঞতা ছাড়াই আসামি জিয়াউল মেজর জেনারেল পর্যন্ত পদোন্নতি পান, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবময় পেশাদারত্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।


