নারীকে ছোট করা ও দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন

নারীকে ছোট করা ও দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন
শফিকুর রহমান | ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) প্রোফাইল থেকে দেওয়া এবং পরে মুছে ফেলা একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে, তা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক নয়। এর মাধ্যমে একটি বিশেষ চিন্তাধারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে চলে এসেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আগে থেকেই জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে যা সন্দেহ করত, এই ঘটনায় সেই দৃষ্টিভঙ্গিটিই আরও নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে।

সেই পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত নয় কারণ ‘আল্লাহ এর অনুমতি দেননি’। এমনকি জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণকে ‘নৈতিক অবক্ষয়’ বা ‘বেশ্যাবৃত্তির এক রূপ’ বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই কথাগুলো মানুষের মনে গভীর আঘাত দিয়েছে। কারণ, এর মাধ্যমে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষকে (নারী) দেখার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সব অস্পষ্টতা দূর হয়ে গেছে।

জামায়াত দাবি করেছে তাদের অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ করা হয়েছিল, কিন্তু এতে মূল বিতর্কের অবসান ঘটছে না। মানুষের ক্ষোভ কেবল একটি বিশেষ শব্দ বা পোস্টের জন্য নয়; বরং ক্ষোভের কারণ হলো–পোস্টটিতে যা বলা হয়েছে তা শফিকুর রহমানের আগের বক্তব্যেরই প্রতিফলন। যেমন, কিছুদিন আগে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তার দল বা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে কোনো নারীকে তিনি দেখতে চান না।

তখন জামায়াতের বড় বড় নেতারাও তার সেই কথাকে সমর্থন করেছিলেন। আল-জাজিরার সাক্ষাৎকার আর এই বিতর্কিত পোস্টের মধ্যে পার্থক্য কেবল শব্দের। সাক্ষাৎকারে তিনি ‘বেশ্যাবৃত্তি’ শব্দটি ব্যবহার না করলেও এই পোস্টে সেটি সরাসরি বলা হয়েছে। এই একটি শব্দই পুরনো এক আদর্শিক বিতর্ককে জাতীয় সংকটে রূপ দিয়েছে।

ভাষার ব্যবহার অনেক বড় বিষয়, বিশেষ করে যখন কেউ দেশ শাসনের স্বপ্ন দেখেন। ঘরের বাইরে নারীর কাজ করাকে বেশ্যাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা কেবল রক্ষণশীলতা নয়, এটি মানুষকে অপমান করার নামান্তর। এর মাধ্যমে শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, গার্মেন্টস কর্মী, সাংবাদিক বা পুলিশে কর্মরত নারীদের এক কথায় হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এমন এক দেশ যেখানে নারী কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠী নয়, বরং তারা জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই এই ধরনের আক্রমণাত্মক ভাষা কেবল নারীদের নয়, বরং প্রতিটি মানুষের মা, বোন বা কন্যাকে ছোট করার সমান। মানুষের এই ক্ষোভ কোনো সাজানো বিষয় নয়; এটি ছিল একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কারণ, মানুষ দেখেছে, যাদের উপার্জনে বা সেবায় তাদের পরিবার চলে, তাদেরকেই ঢালাওভাবে ‘অনৈতিক’ বলা হচ্ছে।

এর রাজনৈতিক প্রভাবও বেশ গভীর। জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিতে চায় এবং ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে দল জনজীবনে নারীর উপস্থিতিকে পাপ মনে করে, সেই দলের কাছে কি নারীরা সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ?

আরও পড়ুন

নারীদের নেতৃত্ব দেওয়া যাবে না এবং তাদের চাকরি করা নৈতিকতার জন্য হুমকি-এই মানসিকতা নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক দেশ চালানো অসম্ভব। একজন হবু প্রধানমন্ত্রী যখন এমন কথা বলেন, তখন বোঝা যায় তিনি ভবিষ্যতে কার স্বাধীনতা কেড়ে নেবেন আর কাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করবেন।

জামায়াত প্রায়ই ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের এসব কথাকে সঠিক প্রমাণ করতে চায়, কিন্তু ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তা ধোপে টিকে না। ইসলাম কখনোই বলেনি যে নারীকে ঘরে বন্দি থাকতে হবে বা তারা নেতৃত্বে আসতে পারবে না।

রাসূল (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, যার উপার্জিত অর্থে ইসলামের শুরুর দিনগুলো মজবুত হয়েছিল। বিবি আয়েশা (রা.) যুদ্ধের ময়দানে যেমন উপস্থিত ছিলেন, তেমনি তিনি ছিলেন ইসলামের জ্ঞানের অন্যতম বড় আধার। ইতিহাসের পাতায় পাতায় মুসলিম নারীদের ব্যবসা, শিক্ষা এবং দেশ পরিচালনার কথা রয়েছে। তাই নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে ‘অনৈসলামিক’ বলা আসলে ধর্মের কোনো শিক্ষা নয়, বরং নির্দিষ্ট এক রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান আরও বেশি বৈপরীত্যে ভরা। এ দেশের লাখ লাখ পরিবার টিকে আছে নারীর উপার্জনের ওপর। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে মাঠের কৃষি বা বিদেশের শ্রমবাজার-সবখানেই নারীর আয় সংসারের হাল ধরে আছে। শফিকুর রহমানের এই ভাবনা যদি কার্যকর হতো, তবে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ত, হাজার হাজার শিশু না খেয়ে থাকত। ধর্মের দোহাই দিয়ে কথা বললেও, এই পরিবারগুলোর মুখে কে খাবার তুলে দেবে-তার কোনো বাস্তব সমাধান তাদের কাছে নেই।

নারীদের প্রতি এমন অবমাননাকর আচরণ জামায়াতের রাজনীতির পুরনো অভ্যাস। এই ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগেই দলটির আরেক নেতা ডাকসু-কে ‘পতিতালয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নারীর স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণকে বারবার নোংরা ভাষায় আক্রমণ করা তাদের রাজনীতির একটি ধরন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, আজকের এই বক্তব্যগুলো সেই পুরনো ক্ষতই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

শফিকুর রহমানের নিজের জীবনের দিকে তাকালেও একটি বড় গরমিল দেখা যায়। তার স্ত্রী একজন ডাক্তার এবং সাবেক সংসদ সদস্য। এই দুটি কাজই করতে হলে বাইরে বের হতে হয় এবং মানুষের নেতৃত্ব দিতে হয়। নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে যা স্বাভাবিক, দেশের সাধারণ নারীর ক্ষেত্রে তা কীভাবে ‘বেশ্যাবৃত্তি’ হয়-তা এক বড় প্রশ্ন।

তা ছাড়া গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ নারীদের মাধ্যমেই শাসিত হয়ে আসছে। নারী প্রধানমন্ত্রীরাই দেশের মূল রাজনীতি পরিচালনা করেছেন। খেলাধুলা থেকে শুরু করে হিমালয় জয়–সবখানেই আমাদের নারীরা সফল। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ‘নারীরা নেতৃত্বে অক্ষম’-এই দাবিটি পুরোপুরি হাস্যকর।

পরিশেষে বলা যায়, ওই একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, তা ছিল অনিবার্য। এটি আসলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাগের বহিঃপ্রকাশ। কোনো দেশ তার অর্ধেক জনসংখ্যাকে বাদ দিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না। উন্নয়ন ও ন্যায়বিচার কেবল তখনই সম্ভব যখন নারী-পুরুষ সবার সমান অধিকার থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে-যে দল নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে পারে না, তাদের হাতে দেশের ক্ষমতা দেওয়া কি ঠিক হবে?

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad