নতুন করে ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলায় গাজায় অন্তত ২৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, বুধবার ভোরে তুফাহ শহর ও খান ইউনিসের মাওয়াসি এলাকায় চালানো ওই হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন একই পরিবারের দুই নবজাতকসহ ১১ সদস্য। এছাড়া পাঁচ শিশু, সাতজন নারী ও দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় থাকা একজন প্যারামেডিকও হামলায় প্রাণ হারিয়েছে।
বার্তাসংস্থা এপির খবরে বলা হয়, উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর পরপরই তা লঙ্ঘন করে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে যুদ্ধবিরতি চুক্তি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তেহরানের দাবি, এ হামলায় তারা তিনজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতা (হামাস) ও আরও কয়েকজনকে হত্যা করেছে। তারা ইসরায়েলি সেনাদের জন্য হুমকি তৈরি করেছিল বলেও দাবি করে আইডিএফ। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এপিকে জানান, বুধবার সকালে হামাস সদস্যদের গুলিতে এক রিজার্ভ সেনা গুরুতর আহত হন। এর পরই গাজায় সবশেষ হামলাগুলো চালানো হয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ওই হামলায় হামাসের প্লাটুন কমান্ডার বিলাল আবু আস্সিকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ২০২৩ সালের হামলায় কিবুত্জ নির ওজে প্রাণঘাতী আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ‘নির্দোষ বেসামরিকদের ক্ষতির জন্য দুঃখ প্রকাশ’ করে ইসরায়েল দাবি করেছে, নজরদারি ও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে বেসামরিকদের ক্ষতি এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
খান ইউনিসে আরেকটি হামলায় তিনজন নিহত হন। নাসের হাসপাতাল জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে এক ১২ বছর বয়সী ছেলে ছিল। ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, ওই তিনজন ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকার দিকে এগিয়ে আসছিলেন এবং সেনাদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিলেন।
গাজা সিটির আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে আরেকটি হামলায় হামাসের একটি সেলের নেতাকে হত্যার তথ্য নিশ্চিত করেছে আইডিএফ। তিনি ২০২৩ সালের হামলায় নাহাল ওজ পর্যবেক্ষণ পোস্ট থেকে অপহৃত এক ইসরায়েলি সেনাকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া, উত্তর গাজার ইসলামিক জিহাদের একজন নেতাকেও হত্যা করার জানিয়েছে ইসরায়েল।
যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, মিশরের মধ্যস্থতায় গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর নানা সময়ে আইডিএফ ছোট পরিসরে গাজায় অভিযান অব্যাহত রাখলেও দ্বিতীয় ধাপ শুরুর পর থেকে ফের বড় পরিসরে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল।
গাজায় ক্রমবর্ধমান হতাহতের সংখ্যা ফিলিস্তিনিদের বলতে বাধ্য করেছে- ‘যুদ্ধ কার্যত থামেনি’। গাজা সিটির ধ্বংসপ্রাপ্ত আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন করেন, ‘যুদ্ধবিরতি কোথায়? মধ্যস্থতাকারীরা কোথায়?’
গাজা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, বুধবারের হামলায় মোট অন্তত ৩৮ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৫৫৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের অর্ধেকই নারী ও শিশু। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই সময়ে তাদের চারজন সেনা নিহত হয়েছে।
মিসর ও কাতারসহ আটটি আরব ও মুসলিম দেশ ইসরায়েলের ‘বার বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানিয়েছে। সোমবার মিশরের রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়াকে যুদ্ধবিরতির জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও যাতায়াত বিলম্ব, ইসরায়েলি সেনাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং কঠোরতায় সীমান্ত ক্রসিং অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার পুরো দিন লেগে যায় কেবল ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে গাজায় প্রবেশ করাতে। এরপর বুধবার ১৫ জন রোগী ও তাদের ৩১ জন স্বজনের গাজা থেকে মিশরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অর্ধেকেরও বেশি মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মুখপাত্র রায়েদ আল-নিমস।
উত্তর সিনাই প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানায়, কিছু ফিলিস্তিনিকে মিশরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ গাজায় ফিরতে পেরেছে কি না সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি কোনো পক্ষ।


