অবশেষে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের ভয়াবহ আগ্রাসনকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিল জাতিসংঘ। সংস্থাটির একটি স্বাধীন তদন্তে আন্তর্জাতিক আইনে সংজ্ঞায়িত ‘গণহত্যার’ পাঁচটি ঘটনার মধ্যে অন্তত চারটিই গাজায় সংঘটনের প্রমাণ মিলেছে।
সোমবার এ বিষয়ক নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। এতে বলা হয়েছে, একটি জাতিসত্তার নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করা, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন, ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বাস্তুচ্যুত করা এবং মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা, জন্ম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণসহ ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার বেশকিছু যুক্তসঙ্গত প্রমাণ মিলেছে।
২০২১ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল গঠিত এই স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই। তিনি রুয়ান্ডার গণহত্যার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সভাপতিও ছিলেন।
প্রতিবেদনে ইসরায়েলি নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য ও সেনাদের অভিযান ও আগ্রাসী মনোভাবকেও ‘গণহত্যা চালানোর’ চেষ্টার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার অধিকাংশ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, ৯০ শতাংশের বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা, পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং জাতিসংঘ-সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্ট গাজায় ‘গণহত্যা চালানোর’ উসকানি দিয়েছেন। তদন্ত কমিশনের ভাষায়, ইসরায়েলি বাহিনী ও কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড ‘গণহত্যার অভিপ্রায়েরই’ একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা।
একই সঙ্গে কমিশন সতর্ক করেছে, গণহত্যা কনভেনশন অনুযায়ী অন্য সব রাষ্ট্রের এখনই দায়িত্ব হলো এই অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন করা। অন্যথায় তারাও গণহত্যার সহায়তাকারী হিসেবে দায়ী হতে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘বিকৃত ও মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র কমিশনের তিন বিশেষজ্ঞকে ‘হামাসের মুখপাত্র’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তাদের দাবি, জাতিসংঘের তদন্ত কর্মকর্তারা পুরোপুরি হামাসের ‘ভুয়া তথ্যের’ ওপর নির্ভর করেছেন।
ইসরায়েলি ওই মুখপাত্র জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিপরীতে বলেন, ‘আইডিএফ নয়, বরং হামাস ইসরায়েলে গণহত্যা চালানোর চেষ্টা করেছে। তারা ১২শ মানুষ হত্যা করেছে, নারীদের জিম্মি করেছে, প্রকাশ্যে সব ইহুদিকে হত্যার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।’

নেতানিয়াহু সরকারের দাবি, গাজায় তাদের পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান কেবল হামাসকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে, সাধারণ ফিলিস্তিনি জনগণকে নয়। তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে গাজায় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানিয়েছে।
তবে তদন্ত কমিশনের প্রধান নাভি পিল্লাই বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত ৭ অক্টোবরেই বলেছিলেন, “হামাস যেখানে অবস্থান করছে সেইসব জায়গায় ভয়াবহ প্রতিশোধ নেওয়া হবে। যে শহরে হামাস আছে সে শহরটিকে আমরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করব।” তার বক্তব্যে গাজা সিটির সব মানুষকে স্পষ্টভাবে দায়ী করা হয়েছে।’


