গণভোটে সংস্কার ইস্যুতে প্রাপ্ত জনসমর্থনকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতা কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়ক আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, ‘গণভোটের ফলাফল কেবল মতামত নয়; এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। সংস্কারের পক্ষে যে স্পষ্ট জনরায় এসেছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর।’
শনিবার সকালে রাজধানী ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দল, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল, সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্ত পক্ষ এবং সংসদের বাইরের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
তার মতে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে পারলেই গণভোটের বার্তা বাস্তব ফলাফলে পরিণত হবে। জাতীয় ঐকমত্যের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো যে সহনশীলতা ও আপসের মনোভাব দেখিয়েছে, সেই ধারা বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন তিনি।
তিনি জানান, জনরায় সমর্থিত যে প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বর্তায়। এ সময় সাধারণ জনগণ ও তরুণদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার এখনই সময়।
বাংলাদেশের নাগরিকরা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্বিধাহীনভাবে জুলাই মাসে জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবসমূহের অনুকূলে রায় দিয়েছেন দাবি করেন তিনি।
এই রায় স্পষ্ট করে যে দেশের বৃহৎ অংশের নাগরিক আর পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চান না; তারা চান পরিবর্তন, সংস্কার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার আধুনিকীকরণ—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী করেছেন বলে জানান তিনি। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, গণভোটে অংশ নিয়েছেন সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন ভোটার, যা মোট ভোটারের প্রায় ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে চার কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, যা কাস্ট করা মোট ভোটের ৬৮ দশমিক ছয় শতাংশ। অন্যদিকে ‘না’ ভোট পড়েছে দুই কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি, যা প্রায় ৩১ শতাংশ। উল্লেখযোগ্যভাবে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এই গণভোটে অংশগ্রহণের হার প্রায় এক শতাংশ বেশি।
আলী রীয়াজ উল্লেখ করেন, গণভোটের আগে প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন—জাতীয় রূপান্তর কখনো একক সিদ্ধান্ত বা একক শাসনের মাধ্যমে হবে না; জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে। দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে জনগণকে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ দিতেই গণভোট আয়োজন করা হয়েছে।
জনগণ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সংস্কারের পক্ষে যে জনরায় এসেছে, তা কেবল সংখ্যার বিচারে দেখার বিষয় নয়। এই রায় ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া, আহত হওয়া বা অকুতোভয় সংগ্রামকারীদের প্রতিও এক ধরনের স্বীকৃতি—যাদের আত্মত্যাগ নাগরিকদের ওপর একটি দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
এ সময় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানান আলী রীয়াজ। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় পর ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় ভোটারদের ভূমিকাকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ সংশ্লিষ্টরা।


