স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী চলচ্চিত্রকারদের একজন ছিলেন খান আতাউর রহমান।
তিনি একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার এবং প্রযোজক ছিলেন। চলচ্চিত্র জগতে পরিচিত ছিলেন খান আতা নামে।
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই গুণীর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল সোমবার। ১৯৯৭ সালের এই দিনে তিনি ৬৮ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
১৯২৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে জন্ম নেন খান আতা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি ঢাকা জেলা সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হন। বলা যায়, তখন থেকেই তার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পথচলা শুরু। ঢাকা কলোজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।
কিন্তু জন্মগত বোহেমিয়ান স্বভাব এবং অভিনয়ের প্রতি অগাধ টান তাকে বারবার দিক বদলাতে বাধ্য করে। একসময় তিনি বাড়ি ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে পরিবারের এক সদস্যের হাতে ধরা পড়ে যান। পরে পরিবারের চেষ্টায় তিনি মেডিকেল ছাড়েন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও মন টিকল না তার। ১৯৪৬ সালে তিনি লন্ডনে ফটোগ্রাফির ওপর একটি বৃত্তি পান। যদিও শেষ পর্যন্ত সেখানে যাননি। ১৯৪৯ সালে অভিনয়ের স্বপ্নে ভারতের মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন কাজের খোঁজে। জ্যোতি স্টুডিওতে ক্যামেরাম্যান জাল ইরানির শিক্ষানবিশ হিসেবেও কাজ করেন।
১৯৫০ সালে করাচি রেডিওতে সংবাদ পাঠক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ফতেহ লোহানীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, যা তার শিল্পচর্চার আগ্রহকে আরও গভীর করে।
চলচ্চিত্রের নেশায় তিনি প্রায়ই লাহোর যেতেন। সেখানে সারেঙ্গি বাদক জওহারি খানের কাছে তালিম নেন। ১৯৫২ সালে ফতেহ লোহানী লন্ডনে যাওয়ার পর খান আতাও পোল্যান্ডের একটি জাহাজে লন্ডনে পৌঁছান। সেখানে গান, অভিনয় ও মঞ্চ–সব ক্ষেত্রেই দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
শিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে এবং তার প্রদর্শনী আয়োজনেও তিনি সহায়তা করেন। পরে সিটি লিটারারি ইনস্টিটিউটে থিয়েটারে ভর্তি হন এবং ইউনেস্কোর বৃত্তি পেয়ে নেদারল্যান্ডে যান। ফিরে আবার লন্ডনে থিয়েটার রয়্যাল ও ইউনিটি থিয়েটারসহ বিভিন্ন দলে কাজ করেন; কিছুদিন বিবিসিতেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৫৭ সালে দেশে ফিরে তিনি পাকিস্তান অবজারভার এবং পরে রেডিও পাকিস্তানে গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক, আবৃত্তিকার ও অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন।
অভিনয়ে তার যাত্রা শুরু ১৯৫৯ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ দিয়ে। এতে তিনি আনিস চরিত্রে অভিনয় করেন। একই বছরে এহতেশাম পরিচালিত ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছিল তার প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র। এরপর ‘কখনো আসেনি’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘সোনার কাজল’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘সুজন সখী’সহ বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
সঙ্গীতে তার প্রথম কাজ ‘এ দেশ তোমার আমার’। ১৯৬২ সালের ‘সূর্যস্নান’ ছবিতে তার সুর করা ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে’ জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৬৩ সালে ‘কাঁচের দেয়ালে’ সুর ও গীত রচনার জন্য পুরস্কার পান।
উর্দু চলচ্চিত্রেও তিনি নিয়মিত সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় তার নিজের কণ্ঠে গাওয়া ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি’ গানটি আজও অমর। পরে ‘এ কি সোনার আলোয়’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’সহ অসংখ্য গান তিনি তৈরি করেন। প্রায় ৫০০ গানের গীতিকার হিসেবে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেন।
পরিচালনায় তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘অনেক দিনের চেনা’ (১৯৬৩)। ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘অরুণ বরুণ কিরণমালা’, ‘জোয়ার ভাটা’, ‘সুজন সখী’, ‘হিসাব নিকাশ’, ‘পরশপাথর’—তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। জীবনের শেষদিকে তিনি নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘এখনো অনেক রাত’। এছাড়া জসীম উদ্দীন, আব্বাস উদ্দিনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন।
‘নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা’ (১৯৬৭) এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিলেও ‘সুজন সখী’ (১৯৭৫) এর জন্য তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হন। পরে ‘এখনো অনেক রাত’ (১৯৯৭)–এর জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক এবং শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।


