পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় রোববার নিরাপত্তা বাহিনী, বাঙালি বসতি স্থাপনকারী ‘সেটেলার) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় গুলিবিনিময়ে অন্তত তিনজন পাহাড়ি নিহত হয়েছেন এবং ১৩ সেনা সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এ সহিংসতার পর, ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ফেসবুক পোস্টে তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে ‘অনির্দিষ্টকালের’ অবরোধ ডেকেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন করে গুইমারার রামসু বাজারে দুপুর ১টার দিকে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দুর্বৃত্তরা কয়েকটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-পরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ সাংবাদিকদের জানান, নিহতদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে ছিল।
‘অন্যরাও আহত হয়েছেন, তারা চিকিৎসা নিচ্ছেন,’ বলেন তিনি।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, সবশেষ গুইমারার পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কীভাবে এবং কারা গুলি চালিয়েছে, সে বিষয়টি এখনো সুস্পষ্ট নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পরই তা জানা যাবে।’
নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউপিডিএফ সদস্যরা পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি চালিয়েছে।
তবে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বাঙালি বসতিও গুলি চলেছে। নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা গুলি চালিয়ে প্রতিরোধ করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুঃখ প্রকাশ
এদিকে ওই তিন পাহাড়ি নিহতের ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলায় দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি নিহত এবং মেজরসহ ১৩ জন সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিনজন পুলিশ সদস্য এবং আরও অনেকে আহতের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।’
বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, নিহতদের মরদেহ খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তবে তাদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
টাইমস অব বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দুপুরে অবরোধ চলাকালে গুইমারা খাদ্য গুদাম এলাকায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় আঘাত ও গুলিবিদ্ধ হয়ে নারীসহ প্রায় ৩০জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে পাহাড়ি-বাঙ্গালি ও সেনাবাহিনীর সদস্য রয়েছেন। ওই ঘটনায় আহত চারজনকে বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলেন, অংচিং মারমা (১৬), বিকাশ ত্রিপুরা (২৬), চিংকিউ মারমা (২৬) ও উশ্য মারমা (২২)। এদের চারজনের বাড়িই গুইমারা এলাকায়।
এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধারণপূর্বক শান্ত থাকার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে।’
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় মারমা জনগোষ্ঠীর এক স্কুলছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে খাগড়াছড়ি সদর থানায় মামলা দায়ের করেন।

পরদিন বুধবার সকালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সন্দেহভাজন যুবক শয়ন শীলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এই ধর্ষণের প্রতিবাদে শুক্রবার আধাবেলা ও শনিবার সকাল-সন্ধ্যা অবরোধের ডাক দেয় পাহাড়ি সংগঠনগুলো। তবে অবরোধে পরিস্থিতি অবনতি হলে খাগড়াছড়ি পৌরসভা, সদর উপজেলা ও গুইমারায় জারি করা হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা। ১৪৪ ধারার ভেতরেই শনিবার সন্ধ্যায় জেলা সদরে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতে জড়ালে বেশ কয়েকজন আহত হন। এর জেরে ‘জুম্ম (পাহাড়ি) ছাত্র-জনতা’ এই অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ডাকা দেয়।
অবরোধ চলাকালে রোববার দুপুরে গুইমারার রামেসু বাজারে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে বাজারের বেশ কয়েকটি দোকান ও সংলগ্ন কয়েকটি বাড়িঘর পুড়ে যায়।
মুহূর্তেই বাজারে আগুন দেওয়ার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, আগুনে বাজারের দোকানপাট জ্বলছে। বাজারটির দোকানমালিকদের অধিকাংশ পাহাড়ি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনার পর খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকাজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।
দুপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে অবরোধের সমর্থনকারীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায়।


