মাঠজুড়ে পাকা বোরো ধান, খলায় সোনালি ধান। ঘরে ধান তুলতে সবকিছুই প্রস্তুত ছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কৃষকের সব স্বপ্ন ধুলিষাৎ হওয়ার পথে। একই সঙ্গে নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আতঙ্ক নেমে এসেছে কৃষক পরিবারে।
কোথাও কাটা ধান খলায় শুকানোর অপেক্ষা, কোথাও পাকা ধান কাটার অপেক্ষা। আবার কোথাও কোথাও তলিয়ে যাওয়া ফসল ঠেকানো চেষ্টা। সুনামগঞ্জের প্রায় প্রতিটি হাওরে এখন একই চিত্র। জেলার ১২ উপজেলার ১৩৭ টি হাওরের মধ্যে অধিকাংশ হাওরেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কৃষকের ধান তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক পরিবার-পরিজন নিয়ে মাঠেই অবস্থান করছেন। কিন্তু বৃষ্টির কাছে যেন সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক জানান, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করা হয়েছে। তারমধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে, যা শতকরা হিসেবে ৪৭ শতাংশ।
কৃষকরা বলছেন, এখনও খেত থেকে কেটে আনা ধানের ২০ শতাংশ খলায় রয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পারায় ফসল ঘরে তোলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও ফসল রক্ষা বাধ ভেঙে পানি ঢুকে ৭ হাজার ৫৭ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষক ও কৃষক সংগঠনের দাবি, জেলায় অন্তত ২০ হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
শ্রমিক সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক জায়গায় বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও ‘নয়নভাগা’চুক্তিতে ধান কাটাতে হচ্ছে, যেখানে কৃষক নিজের ফসলের বড় অংশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। তবুও রক্ষা নেই, কাটা ধানও ঘরে তুলতে পারছে না কৃষক।
শাল্লা উপজেলার ভান্ডাবিল হাওরের আছানপুর গ্রামের কৃষক ঝন্টু চন্দ্র দাস বলেন, বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটতে হয়েছে। যা কেটেছেন, তাও খলায় রেখে বাঁচাতে পারেননি। রাতের বৃষ্টিতে মাড়াই করা ধানও পানিতে ডুবে গেছে।
তিনি বলেন, ‘ধানের চিন্তায় এখন রাতে ঘুম আসে না। এই ফসলই আমাদের সারা বছরের ভরসা।’
এমন চিত্র পুরো হাওরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারে। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে শাল্লার ছয়টি হাওরের প্রায় সব কৃষকই এখন একই সংকটে। জমি ডুবে যাচ্ছে, খলায় রাখা ধান ভিজে নষ্ট হচ্ছে। আবার যেগুলো কাটা হয়নি সেগুলো নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এদিকে, যান্ত্রিক সহায়তাও কার্যত অচল। জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন নামানো যাচ্ছে না। কোথাও জ্বালানি সংকটে মেশিন পড়ে আছে হাওরের ধারে। ফলে সময়মতো ফসল ঘরে তোলা অসম্ভব হয়ে উঠছে।
অন্যান্য হাওরেও একই চিত্র। পাগনা হাওরের কৃষক রেনু মিয়া বলেন, ‘কাটা ধান খলায় পড়ে গন্ধ ধরছে। পানি থাকায় মেশিন নামানো যায় না, মানুষও কম।’
শনির হাওরের কৃষক জিয়াউর রহমানের কথায় আরও উদ্বেগ, ‘অর্ধেকের বেশি ধান এখনও জমিতে। রোদ নাই, শুকাতে পারছি না। হাঁটু-উরু পানির খেতে নামাও কষ্ট।’
ভরাম হাওরের কৃষক রায়হান মিয়া বলেন, বৃষ্টির কারণে ধান শুকানো যাচ্ছে না। খলাতেই ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে।
শাল্লা উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক একরামুল হোসেন বলেন, বৃষ্টির পানি তাদের এলাকার কাটা ও মাড়াই করা ধানও ভাসিয়ে নিয়েছে। খেতের পাকা ধান পানিতে আরো ডুবে গেছে। এবার কোনভাবেই চাষাবাদের খরচ তুলতে না না পেরে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষক।
সুনামগঞ্জ হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় মাস খানেক আগেই হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এরপর থেকেই জলাবদ্ধতা বাড়ছে। তবে গত তিন-চার দিনের ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন হাওরের পানি উপচে কাটা ধান রাখা খলায়ও ডুবিয়ে নিচ্ছে। এতে ফসলের পাকা ফসলের সঙ্গে কাটা ধানও নষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতায় অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে ক্ষতির পরিমাণ অল্প দেখানো হচ্ছে। সোমবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় জানানো হয়েছে ৫০-৬০ ভাগ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই সঠিক নয়।

একই কথা জানিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার। তিনি বলেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষয়-ক্ষতির যে পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে তাতে হাওরের কৃষকরা সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হবেন।
এদিকে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাতে পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের কারণে আগাম বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পানি বাড়লে হাওরের ১১০টি ক্লোজার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২২ মিলিমিটার। একই সময়ে পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ সেন্টিমিটার। বর্তমানে এই নদীর পানি সেখানে বিপৎসীমার ১৬৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত এবং ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বর্ষণের ফলে সুনামগঞ্জের সুরমা, কুশিয়ারা ও অন্যান্য নদ-নদীতে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৩ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এই কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে সুরমাসহ জেলার সব নদীর পানি বেড়ে আকষ্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বন্যা বা পানি বাড়লেও ফসল রক্ষা বাঁধ রক্ষা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।


