চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার শাসনামলের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক পশ্চিমা মিত্ররা হাজির হয়েছেন বেইজিংয়ে। যারা একসময় চীনকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছেন, তারাই এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্কের পথ খুঁজছেন।
বার্তা সংস্থা এপির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমনই তথ্য। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সম্প্রতি নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক সাজাতে এগিয়ে এসেছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের একাধিক দেশ। এই কূটনৈতিক তৎপরতা বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই চীনঘেঁষা কূটনীতির পেছনে বড় কারণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাড়তে থাকা দূরত্ব। দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বেশিরভাগ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেই সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। তার মেয়াদের শুরু থেকেই ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে মিত্রদেশগুলোর ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ, একতরফা চাপ এবং তাদের স্বার্থ উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে। ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেওয়ার দাবি তোলার পর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে গভীর অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই এখন বিকল্প কৌশল ভাবতে শুরু করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ও শক্তিশালী কূটনৈতিক বন্ধু হিসেবে সবার প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে এমনই এক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চীন সফর করে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি করেছেন। যার অধীনে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং কানাডার ক্যানোলা তেলের ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে।
এর আগে, ২০২৪ সালে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে মিল রেখে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন অটো শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া। তবে কার্নির চুক্তি সেই অবস্থান থেকে বড় ধরনের সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বের হয়ে গত ৮ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেন। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এই সম্পর্ককে ‘আরও শক্তিশালী বন্ধুত্ব’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন মার্ক কার্নি।

কেবল কানাডাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি পেছনে ফেলে চলতি সপ্তাহেই চীনে পৌঁছেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। এটিও ৮ বছর পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। নিরাপত্তা, চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার এবং হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনের মতো ইস্যুতে চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই শীতল সম্পর্ক বজায় রেখেছিল যুক্তরাজ্য।
তবে এবার স্টারমার ও শি জিনপিং কৌশলগত অংশীদারত্বের কথা বলেছেন। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার মতো ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন তারা। সফরের ফল হিসেবে চীনে যুক্তরাজ্যের স্কচ হুইস্কির ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে। ব্রিটিশ পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ৩০ দিনের ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগও দিয়েছে বেইজিং।
অন্যদিকে স্টারমারের বেইজিং সফর নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘এটি “খুবই বিপজ্জনক” সিদ্ধান্ত।’ চীনের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তিকেও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করলে কানাডার ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপের হুমকিও দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে চীনের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি থেকে সতর্ক করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি টেবিলে না থাকি, তাহলে আমরা মেনুতেই থাকব।’ অবশ্য তিনি নিজেই আগামী এপ্রিলে চীন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ইউরোপের অন্য প্রান্ত থেকে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেত্তেরি অর্পোও চীন সফর করেছেন। তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করে টেকসই নির্মাণ, জ্বালানি এবং প্রাণী রোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার চুক্তি সই করেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং মানবাধিকার ইস্যুতে চীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মার্টিন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে চীন সফর করেছেন।
এ ছাড়া, আগামী মাসে চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎজের। চ্যান্সেলর হিসেবে এটি হবে তার প্রথম বেইজিং সফর। জার্মানির সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজে নির্ভরতা এই বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য মের্ৎজ আগের জার্মান চ্যান্সেলরদের তুলনায় চীনের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে এই কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনেও বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপবিরোধী অবস্থান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস বলেন, চীন দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে তাদের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল বেশ শক্তিশালী। তবে একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন অংশীদারত্ব গড়ে তোলাও জরুরি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপ আসলে চীনের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকছে না। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায়, একটি ব্লক হিসেবে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ইউরোপের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে।
চীনের লক্ষ্য ইউরোপের সমৃদ্ধ বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার বজায় রাখা। বিনিময়ে তাদের খুব বেশি ছাড় দেওয়ারও প্রয়োজন পড়ছে না।


