খণ্ডিত বক্তব্যের অপপ্রয়োগ: ধর্মীয় আবেগ উসকে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের অপচেষ্টা

খণ্ডিত বক্তব্যের অপপ্রয়োগ: ধর্মীয় আবেগ উসকে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের অপচেষ্টা
Advertisement
Advertisement

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভয়ংকর ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। প্রযুক্তির মারপ্যাঁচে কোনো বক্তব্য বিকৃত না করেও কেবল কথার প্রেক্ষাপট বদলে দিয়ে বা দীর্ঘ বক্তব্যের বিশেষ কিছু অংশ কেটে নিয়ে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা ব্যবহার করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার এই কৌশলটি বর্তমানে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও ভুল বার্তা ছড়াচ্ছে।

সম্প্রতি ডিসমিসল্যাব-এর একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দীর্ঘ বক্তব্যের একটি ক্ষুদ্র অংশ ভিডিও ক্লিপ আকারে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের ‘ধর্মবিদ্বেষী’ বা ‘নাস্তিক’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। একে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ডিকন্টেক্সচুয়ালাইজেশন’ বা প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নকরণ। অর্থাৎ বক্তার বক্তব্যটি সঠিক হলেও তা কোন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, সেটি গোপন রেখে খণ্ডিত অংশটি প্রচার করায় অর্থের আমূল পরিবর্তন ঘটছে।

এমনই একটি ঘটনার শিকার হয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। তার একটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিওতে শোনা যায় তিনি বলছেন, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা বায়তুল মোকাররমে এসে পূজা দিতে পারবেন। অথচ মূল ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি মূলত প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে বলছিলেন যে, তারা ক্ষমতায় আসার জন্য এমন সব ‘উদ্ভট ফতোয়া’ দিতে পারে। কিন্তু তার সতর্কবাণীটিকেই কৌশলে তার নিজের বক্তব্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক হারুনুর রশিদ হারুনের সহধর্মিণী রৌশন আরা শিরিনের বক্তব্যকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

পাপিয়ার একটি ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে শোনা যায় তিনি ইসলামকে তামাকের সঙ্গে তুলনা করছেন। অথচ পূর্ণাঙ্গ ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি মূলত জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করতে গিয়ে তামাকের সঙ্গে দলটির তুলনা করেছিলেন, ইসলামের সঙ্গে নয়।

আরও পড়ুন

রৌশন আরা শিরিনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলতে গিয়ে ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি’ না করার প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করেছিলেন, তাকে ‘ধর্ম অবমাননা’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারণার এই নোংরা কৌশলের ভয়াবহতা ফুটে ওঠে মানিকগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবিরের ভিডিওর ক্ষেত্রে। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি হিন্দুদের দেশ ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন। অথচ মূল ভিডিওতে তিনি ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করছিলেন। জিন্নাহ কবির এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে জানিয়েছেন, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোট তার থেকে বিমুখ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপটি ছড়ানো হয়েছে।

নাঙ্গলকোট উপজেলার বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসের বক্তব্যে ‘ধানের শীষে ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়ার’ কথা শোনা গেলেও মূল ভিডিওতে দেখা যায় তিনি অন্য এক নেতার এমন দাবির তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা জানাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে জনআবেগ প্রভাবিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো ধর্ম। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার তকমা সেঁটে দিতে পারলে তাকে দ্রুত জনরোষের মুখে ফেলা যায়।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের অধ্যাপক ড. সুমন রহমান মনে করেন, এটি একটি পরিকল্পিত ‘প্রোপাগান্ডা ওয়ারফেয়ার’। যেখানে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের প্রতিটি মুভমেন্ট রেকর্ড করে তা বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি কেবল প্রার্থীর ভাবমূর্তিই নষ্ট করছে না, বরং ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গেও প্রতারণা করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ ব্যবহারকারীরা মূল উৎস যাচাই না করেই এসব ভিডিওতে ‘কাফির’ বা ‘মুরতাদ’ এর মতো আক্রমণাত্মক মন্তব্য করছেন, যা সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়িয়ে তুলছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad