অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন লিওনেল মেসি। সোমবার রাতে ডালাসে খেলা ম্যাচের মাধ্যমে তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসার পুরুষদের রেকর্ড এবং মার্তার সামগ্রিক রেকর্ড, উভয়কেই ছাড়িয়ে গেছেন। মেসির এই নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলের জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি নকআউট পর্বের টিকিট কেটেছে।
এই স্মরণীয় মুহূর্তটি এসেছে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র ঠিক ৪০তম বার্ষিকীতে, যা তার পূর্বসূরির ছায়া থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসা এই ফুটবল জাদুকরের জন্য ছিল এক উপযুক্ত পটভূমি।
টেক্সাসের এই ঐতিহাসিক রাতে মেসি যেসব রেকর্ড ভেঙেছেন বা নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেছেন, তার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা
ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে থিয়াগো আলমাদার চমৎকার ডামির পর বাম দিক থেকে ফাকুন্দো মেদিনার বাড়ানো ক্রস থেকে বল জালে জড়িয়ে নিজের ১৭তম বিশ্বকাপ গোলটি করেন মেসি, যা তাকে ক্লোসার দীর্ঘদিনের পুরুষদের রেকর্ডের সমকক্ষে এবং পরবর্তীতে তা ছাড়িয়ে যেতে সাহায্য করে।
এরপর ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে অর্থাৎ স্টপেজ টাইমে জুলিয়ান আলভারেজের শট গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লেগার ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বলে আলতো ছোঁয়ায় নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি, যা তার মোট গোল সংখ্যাকে নিয়ে যায় ১৮ তে, জার্মান স্ট্রাইকারের চেয়ে যা দুটি বেশি। তিনি ৫টি ভিন্ন বিশ্বকাপ জুড়ে এই ১৮টি গোল করেছেন, যার মধ্যে ১৪টি বাম পায়ে এবং ৪টি ডান পায়ে; যার ৫টি এসেছে বক্সের বাইরে থেকে এবং ১৩টি ভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে।
মার্তার সর্বকালের রেকর্ড ভাঙা
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির এই ঐতিহাসিক জোড়া গোল তাকে মার্তার ১৭ গোলের দীর্ঘদিনের রেকর্ড থেকে এগিয়ে নিয়েছে এবং পুরুষ ও নারী, উভয় বিশ্বকাপের সামগ্রিক গোলদাতার তালিকায় তাকে সবার ওপরে বসিয়েছে। তার ১৮তম বিশ্বকাপ গোলটি এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির আগের বেঞ্চমার্ক বা রেকর্ডকে ছাড়িয়ে এক নতুন অনন্য উচ্চতা সেট করেছে।
টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল
বিশ্বকাপের ইতিহাসে টানা ছয়টি ম্যাচে গোল করা মাত্র তৃতীয় খেলোয়াড় হলেন মেসি। এর আগে ১৯৫৮ সালের একক টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের জাঁ ফন্টেইন এবং ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের জাইরজিনহো এই কীর্তি গড়েছিলেন। মেসির এই গোল করার ধারাবাহিকতা মূলত কাতারে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অভিযান থেকে শুরু হয়ে এখনো চলছে।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি নেওয়া ও মিস করার রেকর্ড
ম্যাচের ৯ম মিনিটে ভিএআর আর্জেন্টিনাকে পেনাল্টি দিলে মেসির নেওয়া স্পট কিকটি ডান পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। মেসির এই সাধারণ শটটি নষ্ট হওয়ার পর অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক শ্লেগার উদযাপন করেন। এটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ৩ নম্বর পেনাল্টি মিস, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ।
এর মাধ্যমে তিনি ঘানার সাবেক স্ট্রাইকার আসামোয়াহ গিয়ানের ২টি মিসের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেলেন। তিনি এখন বিশ্বকাপে মোট ৭টি পেনাল্টি নিয়েছেন এবং ৩টি মিস করেছেন, যা এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি নেওয়ারও রেকর্ড। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ক্যারিয়ারে এই প্রথম আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে পেনাল্টি মিস করার পরও একই ম্যাচে গোল করার দেখা পেলেন মেসি।
দুই ম্যাচে পাঁচ গোল
প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির এই জোড়া গোল মাত্র দুই ম্যাচেই তার গোল সংখ্যাকে ৫-এ নিয়ে গেছে, যা তাকে ২০২৬ সালের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। বিশ্বকাপের আলাদা আলাদা ম্যাচে দুই বা ততোধিক গোল করার ক্ষেত্রে মেসির চেয়ে এগিয়ে আছেন কেবল কিলিয়ান এমবাপে। মেসি এখন পর্যন্ত ৪টি ভিন্ন ম্যাচে এই কীর্তি দেখালেন।
২৮ বছরের মধ্যে আর্জেন্টিনার সেরা শুরু
জে গ্রুপে কোনো গোল না হজম করে অর্থাৎ ক্লিন শিট রেখে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচেই জয় তুলে নিল আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম তারা কোনো গোল না খেয়ে বিশ্বকাপের প্রথম দুটি ম্যাচ জিতল। ২০২২ সালের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারার পর থেকে তারা বিশ্বকাপে টানা 8 ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে (৬ জয় ও ২ ড্র), যেখানে অস্ট্রিয়া পুরো ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে মাত্র ১টি অন-টার্গেট শট নিতে সক্ষম হয়েছিল।
জে গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে পারলে আগামী ৩ জুলাই মিয়ামিতে গ্রুপ এইচ-এর রানার্স-আপ দলের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা, আর জর্ডান যদি আলজেরিয়াকে হারাতে ব্যর্থ হয়, তবে আর্জেন্টিনার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থাকা অস্ট্রিয়া নকআউটে যাওয়ার চূড়ান্ত লড়াইয়ে শেষ ম্যাচে আলজেরিয়ার মুখোমুখি হবে।


