কেরালা রাজ্যের মালাপ্পুরম জেলার শান্ত সবুজ প্রকৃতির বুকে অবস্থিত কডিনহি গ্রাম। প্রথম দেখায় একে দক্ষিণ ভারতের আর দশটি সাধারণ গ্রামের মতোই মনে হবে। কিন্তু ভৌগোলিক সীমানায় পা রাখতেই দৃশ্যমান হয় এক অভাবনীয় বাস্তবতা। সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আপনার চোখে পড়বে হুবহু এক চেহারার মানুষের দীর্ঘ সারি।
শৈশব থেকে বার্ধক্য, সব বয়সী যমজের দেখা পাওয়া এখানে কোনো বিস্ময় নয়, বরং যেন একমাত্র ‘স্বাভাবিকতা’। এই ক্ষুদ্র জনপদটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশাল জনতাত্ত্বিক বিস্ময় হিসেবে স্বীকৃত, যা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
অবাক করা পরিসংখ্যান!
ভারতের মতো একটি দেশে, যেখানে যমজ জন্মের হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন, সেখানে এই গ্রামটি সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র তুলে ধরে।
মাত্র প্রায় ২,০০০ জন বাসিন্দার ছোট্ট গ্রামটি বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল, যখন গ্রামের মানুষরা যমজ সন্তান জন্মদানের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেখে। জার্নাল অফ অ্যাপ্লায়েড ডেন্টাল অ্যান্ড মেডিকেল সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, এই গ্রামে প্রতি হাজার শিশুর জন্মে প্রায় ৩৫টি যমজ সন্তানের জন্ম হয়, যেখানে ভারতের বাকি অংশে এই হার প্রতি হাজারে প্রায় ৪ এবং বিশ্বে গড়ে প্রায় ৮টি।
মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে (২০১১-২০১৬) সেখানে ৬০ জোড়া যমজ সন্তানের জন্ম হয়েছিল এবং প্রতি বছরই সেখানে যমজ জন্মের হার বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, গ্রামটিতে প্রায় ২০৪ জোড়া যমজ (মোট ৪০৮ জন) এবং দুটি ট্রিপলেটের সেট ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ জোড়া যমজের বয়স ছিল ১০ বছরের নিচে।
উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, এখানকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই যমজ। তবে এটি হঠাৎ করে নয়। গত ছয় থেকে সাত দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এই উচ্চ হার বজায় রয়েছে।
কডিনহির এই ঘটনার প্রভাব কেবল গ্রামের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। দেখা গেছে, এই গ্রামের মেয়েরা বিয়ের পর ভৌগোলিকভাবে অন্য কোথাও চলে গেলেও তাদের যমজ সন্তান জন্ম দেওয়ার উচ্চ প্রবণতা বজায় থাকে। এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে যে, এই ঘটনার মূলে কেবল স্থানীয় জলবায়ু বা জল নয়, বরং কোনো গভীর বংশগতিসংক্রান্ত বা এপিজেনেটিক ফ্যাক্টর কাজ করছে যা ব্যক্তির সঙ্গে দেশান্তরেও সঙ্গী হয়। এমন বাস্তবতাই কডিনহিকে একটি বৈশ্বিক জৈবিক ল্যাবরেটরিতে পরিণত করেছে।
বিজ্ঞান ও জানে না জবাব
বিশ্বজুড়ে গবেষকদের কাছে এক বংশগতিবিদ্যার ধাঁধার নাম কডিনহি। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের যুগেও এই গ্রামটির রহস্য বিজ্ঞানীরা এখনো খুঁজে বের করতে পারেনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে গবেষণা চালিয়ে বেশ কিছু তত্ত্ব প্রস্তাব করলেও কোনোটিই তার একমাত্র কারণ হিসেবে বলা যায় না।
নাইজেরিয়ার ইগবো-ওরা গ্রামেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়, তবে সেখানে এর কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট এক ধরনের মিষ্টি আলুর (ইয়েম) কথা বলা হয়। কিন্তু কডিনহিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস বা জলের খনিজ উপাদানের হদিস পাওয়া যায়নি যা এই ঘটনার প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষকরা বর্তমানে এমন একটি জিনের সন্ধান করছেন যা নারীদের মধ্যে একাধিক ডিম্বাণু নিঃসরণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তবে সুনির্দিষ্ট সেই জেনেটিক কোডটি এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দূষণ, রাসায়নিক প্রভাব বা জীবনযাত্রার কোনো কৃত্রিম কারণকে এই ঘটনার পেছনে দায়ী হওয়ার সম্ভাবনা থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন।
‘ঐশ্বরিক আশীর্বাদ’
যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত গবেষণা তা গ্রামবাসীদের কাছে এক ‘ঐশ্বরিক আশীর্বাদ’। তারা মনে করেন, কোনো ঐশ্বরিক শক্তি বা বিশেষ গুন এই যমজ রহস্যের কারণ হতে পারে। কিন্তু এটি একটি অমীমাংসিত রহস্য, যেখানে লোকগাঁথা আর ল্যাবরেটরি রিপোর্ট এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে।
কডিনহির বাসিন্দারা তাদের এই বিশেষ অবস্থাকে কেবল ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন না, বরং এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ সালে এই গ্রামে গঠিত হয় ‘টুইনস অ্যান্ড কিনস অ্যাসোসিয়েশন’।
জীবন যেখানে বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু
বর্তমান যুগে ভাইরাল মার্কেটিং এবং বাস্তব জীবনের বিরল ঘটনাবলীর মধ্যে এক অদ্ভুত সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে। সৃজনশীল ব্র্যান্ডগুলো এখন স্থানীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব গল্প তৈরি করছে। কডিনহির এই অনন্য পরিচিতিকে সম্প্রতি ই-কমার্স জায়ান্ট ‘ফ্লিপকার্ট’ তাদের একটি প্রচারণায় ব্যবহার করেছে।
ফ্লিপকার্টের এই বিজ্ঞাপনে কডিনহির বাস্তবতাকে একটি রূপক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে সবকিছুই জোড়ায় জোড়ায় মেলে। এই ‘জোড়া’র ধারণাটিকে ব্র্যান্ডটি তাদের ‘ডাবল ভ্যালু’ এবং ‘ডাবল অফার’-এর সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই বিপণন কৌশলটি কেবল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সফল করেনি, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসাও পেয়েছে।
কডিনহি গ্রামটি আধুনিক বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং প্রকৃতির রহস্যময় সক্ষমতার এক জীবন্ত প্রমাণ। কেন এখানে প্রতি পাঁচজনের একজন যমজ—সেই ‘কেন’র উত্তর আজও অজানা।


