‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’ সোমবার। দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের অস্তিত্বের প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রতীক। গত দুই দশকে বাংলাদেশ জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও, মৃত্যু নিবন্ধনের চিত্র এখনো আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে আছে। এতে দেশের নাগরিক নথি ব্যবস্থায় এক গুরুতর শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, দু’টিই নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি। ভোটাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সামাজিক সুরক্ষা সবকিছুর সূচনা হয় সঠিক নাগরিক নথিভুক্তির মাধ্যমে। তবু দুই দশকের সরকারি নানা উদ্যোগের পরও মৃত্যু নিবন্ধনের হার এখনো আশানুরূপ নয়।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বিভাগের অধীনে পরিচালিত ‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ইমপ্রুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ (সিআরভিএসআইডি, বাংলাদেশ) প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল নাগাদ জন্ম নিবন্ধনের হার যেখানে প্রায় ৮৩ শতাংশে এ পৌঁছেছে, সেখানে মৃত্যু নিবন্ধনের হার এখনো হতাশাজনক। ‘পাবমেট সেন্ট্রাল’-এ প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে মাত্র ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ মৃত্যু নিবন্ধিত হয়, এবং আইনে নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে এই নিবন্ধনের হার এক শতাংশের কম।
তবে এই পরিস্থিতির পেছনে দায়ী কি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব?
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ইউনিসেফ ও স্থানীয় সরকার বিভাগ যৌথভাবে ২৮টি জেলা ও চারটি সিটি করপোরেশনে পাইলট প্রকল্প হিসেবে নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করে। এরপর ২০০৪ সালে প্রণীত হয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, যা ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়। এই আইনে, জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। তারপরও আসেনি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ।
সমস্যার পেছনে মূল কারণ হিসেবে তাই সামাজিক মনোভাব কে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর ওপেন সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ (ওপেন সিআরভিএস) প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প ব্যবস্থাপক নীলিমা ইয়াসমীন বলেন, ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বা ব্যাংক থেকে টাকা তোলার মতো প্রয়োজন ছাড়া সাধারণত মানুষ মৃত্যু নিবন্ধন করার কথা ভাবেই না। অথচ মৃত্যুর সঠিক নিবন্ধন ও মৃত্যুর কারণ সংরক্ষণ ছাড়া কোনো দেশের মোট জনসংখ্যা নির্ধারণ করা বা স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা করা প্রায় অসম্ভব।’
এছাড়াও, মৃত্যু নিবন্ধন না হলে মৃত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে জাল ভোট দেওয়া বা সরকারি ভাতা তোলার মতো প্রতারণার ব্যাপারে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
একই মনোভাবের দিকেই ইঙ্গিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবু হাসনাত মো. কিশোয়ার হোসেন টাইমস অফ বাংলাদেশ কে বলেন, ‘জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে মানুষ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সুশাসনের আওতায় সুরক্ষা পায়, ফলে এটিকে প্রয়োজনীয় মনে করে। কিন্তু মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মানসিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৃত্যুর পর ব্যক্তির আর কোনো দায় থাকে না; পরিবার সাধারণত উত্তরাধিকার সংক্রান্ত প্রয়োজনে সনদ নেয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় মৌখিকভাবে ওয়ারিশানা নির্ধারণ হয়ে যায়, ফলে নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ে না।’
অধ্যাপক হাসনাত মনে করেন, এই মানসিকতা বদলাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই নাগরিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের শেখানো উচিত যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং নাগরিকত্ব ও সুশাসনের অপরিহার্য অংশ।
তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যু নিবন্ধন থেকে পাওয়া তথ্য যেমন মৃত্যুর কারণ, বয়সভিত্তিক মৃত্যুহার, অঞ্চলভেদে রোগ বা দুর্ঘটনার প্রকৃতি রাষ্ট্রের জন্য অমূল্য সম্পদ। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সরকার কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে।’
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের একথাই স্পষ্ট, মৃত্যু নিবন্ধন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি জাতির সুশাসন, ন্যায্য উন্নয়ন এবং সঠিক জনসংখ্যা পরিকল্পনার অপরিহার্য ভিত্তি।


