উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধির মধ্যে অর্থনীতি যখন চাপের মুখে, তখন খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ ব্যবসায় আরও বেশি ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ব্যাংকগুলোর কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৪ শতাংশ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটি কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে।
২১ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর ফলে এ বছর কৃষিঋণ নীতিগতভাবে আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে থাকা কৃষক ও গ্রামীণ উৎপাদকদের কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দিতে হবে ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা।
সোমবার এ নীতিমালা ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পর্যাপ্ত কৃষিঋণ নিশ্চিত করা জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিনির্ধারণে নজরদারি ও তথ্যের মান উন্নত করতে ওয়েবভিত্তিক ‘কৃষিঋণ ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থা’ও চালু করেছে।
নীতিমালায় স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর এবং কৃষকদের বিষয়ে পাওয়া সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত কৃষকদের আরও ভালোভাবে শনাক্ত করার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আনুষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে থাকা ক্ষুদ্র কৃষক, বর্গাচাষি ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ পৌঁছে দিতে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও দলভিত্তিক ঋণ সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং কৃষক দলের সদস্যসংখ্যার সীমা শিথিল করা হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো ব্যক্তি বা দলকে ঋণ দিতে পারবে। এর আওতায় মাছের হ্যাচারি, হাঁস ও মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনের মতো কার্যক্রমও রয়েছে।
কৃষিঋণের পাসবইয়ের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কৃষিঋণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগাম অনুমোদনের শর্তও শিথিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি উন্নয়নে কমন ফান্ড হালনাগাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি এবং তিন হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সারসংক্ষেপও দেওয়া হয়েছে।
ঋণদানের কাঠামোয় জলবায়ু ঝুঁকিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো শস্যবিমা দিতে পারবে, যা আবহাওয়াজনিত ক্ষতির বিরুদ্ধে কৃষকদের সুরক্ষা দেবে।
যোগ্য কার্যক্রমের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে শিমুলের শিকড়, অশ্বগন্ধা, মিশ্রিদানা, রোসেলা, শতাবরী, ট্রি পটেটো, ব্লুবেরি ও ডিমের খোসার মতো উপাদান থেকে তৈরি জৈব সার উৎপাদনে অর্থায়নও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ফলজাতীয় প্রধান ফসলের ক্ষেত্রে ঋণ ও ফসল কাটার সময়সূচিও সংশোধন করা হয়েছে। কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচু চাষে সারা বছর ব্যাংকগুলো অর্থায়ন করতে পারবে এবং ফসল কাটার পর থেকে ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হবে।
বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে এই পরিবর্তনগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যাবে। এক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়লে খাদ্যের দাম কমতে পারে এবং গ্রামীণ আয় ও কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে। তবে এর জন্য উৎপাদন চক্রের উপযুক্ত সময়ে কৃষকদের কাছে ঋণ পৌঁছানো জরুরি।
নতুন নজরদারি ব্যবস্থার লক্ষ্য, শুধু ব্যাংকগুলো ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করছে কি না, তা দেখা নয়। বরং অর্থ কতটা কার্যকরভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধিতে কতটা সহায়তা করছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা।


