‘কলকাতায় যে দরজা খোলার চেষ্টা করেছিলাম, সেটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি’

‘কলকাতায় যে দরজা খোলার চেষ্টা করেছিলাম, সেটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি’
ছবি: টাইমস ইলাস্ট্রেশন
Advertisement
Advertisement

সাফল্য আর লড়াইয়ের দীর্ঘ ২০ বছর। ২০০০ সালে বিকেএসপির জিমন্যাস্টিক্স ম্যাট থেকে শুরু হওয়া যাত্রা থামল ২০২৬ সালের ১ মে ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাসে। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ৬৭টি ম্যাচ, ঘরোয়া ফুটবলে ১৬টি ট্রফি এবং আইএসএলের প্রথম আসরে একমাত্র ভারতীয় নন এমন দক্ষিণ এশীয় ফুটবলার হিসেবে আতলেতিকো দে কলকাতায় নাম লেখানো, সব মিলিয়ে মামুনুল ইসলাম এখন এ দেশের ফুটবলের ইতিহাসের অংশ। অবসরের পর নিজের ক্যারিয়ারের চড়াই-উতরাই, ফেডারেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিক্ততা এবং বিদেশের লিগে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘ডেইলি টাইমস অফ বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক এই অধিনায়ক।

প্রশ্ন: আপনার ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়েছিল কীভাবে?
মামুনুল ইসলাম: শুরুটা ২০০০ সালে বিকেএসপিতে। শৈশবে আমি ফুটবল ও ক্রিকেট দুই খেলাই খেলতাম। ১৯৯৭ সালে ক্লাস ফাইভে বিকেএসপিতে জিমন্যাস্টিক্সে ভর্তি হই। পরে ২০০০ সালে জিমন্যাস্টিক্স ছেড়ে ফুটবলে আসি। ২০০২ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর ফুটবলকেই পেশা হিসেবে বেছে নিই। ২০০৭ সালে যখন আমাদের দেশে পেশাদার লিগ শুরু হলো, তখন থেকেই এটি আমার একমাত্র জীবিকা।

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের শুরুতে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল?
মামুনুল: বড় ভাই বা সিনিয়র খেলোয়াড়দের কাছ থেকে আমি সবসময়ই সহযোগিতা পেয়েছি। সমস্যা ছিল ফেডারেশন কর্মকর্তাদের নিয়ে। কর্মকর্তাদের অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে রুখে দাঁড়ানো কঠিন ছিল। আমি বুঝেছিলাম, পারফরম্যান্সই এর একমাত্র উত্তর। আপনি মাঠে ভালো খেললে কোচ আপনাকে খেলাতে বাধ্য। কর্মকর্তারা আপনাকে বাদ দিতে চাইলেও পারফর্ম করলে তারা খুব বেশিদিন বসিয়ে রাখতে পারবে না।

প্রশ্ন: ফেডারেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপনার বিরোধের কথা শোনা যায়, সে বিষয়ে কিছু বলবেন?
মামুনুল: প্রথম সমস্যা হয়েছিল বাফুফে নির্বাহী কমিটির বর্তমান সদস্য সাঈদ হাসান কাননের সঙ্গে। তখন তিনি জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আমি বাড্ডার হয়ে খেলি, কিন্তু আমি ব্রাদার্স ইউনিয়নে যোগ দিই। এরপর তিনি আমাকে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে অনূর্ধ্ব-২৩, সব দল থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি মাঠে পারফর্ম করায় কোচ আমাকে দলে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালে অধিনায়ক হওয়ার পর সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের সঙ্গেও আমার নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তবে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে যাওয়াতে কেউ আমাকে থামিয়ে রাখতে পারেন নি।

প্রশ্ন: জাতীয় দলের জার্সিতে আপনার প্রিয় মুহূর্ত কোনটি?
মামুনুল: বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়ানোই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন। ২০০৭ সালে অভিষেকের পর থেকে এই লাল-সবুজ পতাকা আর জার্সিই ছিল আমার সব স্বপ্ন ও সাধনা।

প্রশ্ন: আপনার দেখা সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ কারা ছিল?
মামুনুল: অস্ট্রেলিয়া। পার্থে এবং বাংলাদেশে তাদের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা আমার আছে। তারা তখন নেদারল্যান্ডসের মতো দলের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছিল। তাদের খেলোয়াড়রা শারীরিকভাবে অনেক শক্তিশালী। বিশেষ করে টিম কাহিলকে আটকানো ছিল চরম চ্যালেঞ্জের। তিনি আমাদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও করেছিলেন। কিছু খেলোয়াড়কে আসলে পরিকল্পনা করেও আটকানো যায় না। মেসিকে যেমন অনেকে মার্ক করে রাখলেও সে বের হয়ে যায়। কাহিলও আমাদের জন্য একইরকম পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

আরও পড়ুন

প্রশ্ন: আতলেতিকো দে কলকাতায় আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
মামুনুল: আমি লুইস গার্সিয়ার নেতৃত্বে খেলেছি। দেল পিয়েরো, ত্রেজেগে, পিরেজ, কার্লোসদের বিপক্ষে নামার সুযোগ হয়েছিল। কলকাতায় প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আমি বলেছিলাম, আমি এসেছি বাংলাদেশের ফুটবলারদের জন্য বিদেশের লিগের দরজা খুলে দিতে। কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বর্তমান জেনারেশনের কাছে হয়তো আইএসএল খুব বড় কিছু নয়, তারা হামজার খেলা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে মেতে থাকে। কিন্তু সেই সময়ে আমাদের দেশের জন্য ওটাই ছিল সবচেয়ে বড় মঞ্চ।

প্রশ্ন: কলকাতায় পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ না পাওয়ার কারণ কী ছিল?
মামুনুল: আমার মূল সমস্যা ছিল জাতীয় দলের সময়সূচী। সেই উইন্ডোতে জাতীয় দলের খেলা থাকায় আমি কন্ডিশনিং ক্যাম্প করতে পারিনি। কন্ডিশনিং মিস করলে কোচ খেলোয়াড়কে ঠিকভাবে চিনতে পারেন না। আমি এশিয়ান গেমসের জন্য ক্যাম্প করতে পারিনি এবং ফিফা ফ্রেন্ডলি খেলতে তিনবার বাংলাদেশে ফিরেছি। কোচ আমাকে মাঠে দেখার পর্যাপ্ত সময় পাননি। কোচ যদি কোন খেলোয়াড়ের সাথে সময় কাটাতেই না পারে তবে সেই খেলোয়াড়কে নিয়ে সে পরিকল্পনা করবে কিভাবে?

প্রশ্ন: স্পেন এবং মালয়েশিয়া থেকেও আপনার প্রস্তাব ছিল বলে শোনা যায়। এ ব্যাপারটি পরিষ্কার করতেন যদি?
মামুনুল: ২০১৪-১৫ সালের দিকে কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস আমাকে স্পেনের প্রথম বিভাগে খেলার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার কোনো এজেন্ট ছিল না, আর এজেন্ট ছাড়া স্পেনে চুক্তি করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার ক্লাব থেকে প্রস্তাব থাকলেও আর্থিক কারণে যাওয়া হয়নি। তখন বাংলাদেশে আমি ৪০-৫০ লাখ টাকা পেতাম, সেখানে মালয়েশিয়া থেকে ২০ লাখ টাকার অফার নেওয়াটা যৌক্তিক ছিল না।

প্রশ্ন: বর্তমানে শুধুমাত্র আমাদের মধ্যমাঠের জোরেই কি আমরা এশিয়ান কাপ খেলতে পারবো?
মামুনুল: আমাদের বর্তমান মিডফিল্ড দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সেরা। কিন্তু শুধু মিডফিল্ড দিয়ে এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করা সম্ভব নয়। আমাদের একজন ভালো মানের স্ট্রাইকার দরকার, যেমনটা ভারতের সুনীল ছেত্রী। গোলরক্ষক এবং ডিফেন্সেও উন্নতি প্রয়োজন। আমাদের বর্তমান ফুলব্যাকরা আধুনিক ফুটবলের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। নাসির উদ্দিন চৌধুরী, ওয়ালী ফয়সাল বা মিশুরা যেভাবে ওভারল্যাপ করে ক্রস করত, সেই ধার এখন দেখা যায় না। হামজা চৌধুরী বা শমিত শোমদের ওপর আমাদের ভরসা আছে, কিন্তু একজন প্রপার নাম্বার-নাইন গোলস্কোরার ছাড়া বড় সাফল্য কঠিন।

প্রশ্ন: ফুটবল থেকে অবসরের পর আপনার পরিকল্পনা কী?
মামুনুল: আপাতত কোনো বড় পরিকল্পনা নেই। আমি সরকারি চাকরিতে আছি, সেখানেই এখন সময় দেব।

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকালে কোন অর্জনে সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করেন?
মামুনুল: দক্ষিণ এশীয় গেমসে (এসএ গেমস) অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে স্বর্ণ জয়। আমি সেই দলের অধিনায়ক ছিলাম, আমরা টুর্নামেন্টে কোনো গোল হজম করিনি। এবং সেই টুর্নামেন্টে প্রথম গোলটিও আমার ছিল। এছাড়া এশিয়ান গেমসে ২৮ বছর পর বাংলাদেশের জয়ের গোলটি আমার পা থেকেই এসেছিল। আবাহনীর হয়ে আইএফএ শিল্ডে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলকে তাদের মাঠে হারানোর স্মৃতিগুলোও সবসময় স্পেশাল হয়ে থাকবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad