ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবে অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল রজার কাম্বা মুলাম্বা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা নমুনায় রুয়াম্পারা, মংওয়ালু ও বুনিয়া স্বাস্থ্য অঞ্চলে ইবোলা ভাইরাসের বান্ডিবুগিও ধরনের আটটি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।’
এ পর্যন্ত ভাইরাসটির ২৪৬টি সন্দেহভাজন সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সন্দেহভাজন প্রথম রোগী ছিলেন এক নার্স, তিনি বুনিয়ার ইভানজেলিক্যাল মেডিকেল সেন্টারে মারা যান। তার দেহে জ্বর, রক্তক্ষরণ, বমি ও তীব্র দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা গিয়েছিল।
কঙ্গো সরকার জানিয়েছে, নতুন ইবোলা সংক্রমণ মোকাবিলায় তারা জনস্বাস্থ্য জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র (পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার) চালু করেছে। একই সঙ্গে মহামারি নজরদারি ও পরীক্ষাগার পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কঙ্গো সরকারের আগেই শুক্রবার আফ্রিকার শীর্ষ জনস্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানায়, ইতুরি প্রদেশে ইবোলার প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত হয়েছে। তাদের হিসাবে মৃতের সংখ্যা তখন পর্যন্ত ছিল ৬৫।
সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, মারাত্মক সংক্রামক ইবোলা মোকাবিলায় কঙ্গো, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেন সীমান্তজুড়ে নজরদারি, প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা যায়।
সংস্থাটি জানায়, অধিকাংশ মৃত্যু ও সন্দেহভাজন সংক্রমণ মংওয়ালু ও রুয়াম্পারা স্বাস্থ্য অঞ্চলে শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া সংক্রমণের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাদেশিক রাজধানী বুনিয়াতেও সন্দেহভাজন সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বলেছে, প্রাথমিক তথ্যে ভাইরাসটির অ-জাইরে ধরনের উপস্থিতির ইঙ্গিত মিলেছে। ভাইরাসটির এই নতুন ধরন আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে জিন বিশ্লেষণ চলছে।
কিনশাসার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর বায়োমেডিক্যাল রিসার্চের প্রধান এবং ইবোলা ভাইরাসের সহ-আবিষ্কারক কঙ্গোলিজ ভাইরোলজিস্ট জ্যঁ-জাক মুয়েম্বে রয়টার্সকে বলেন, ‘কঙ্গোতে আগের ১৬টি প্রাদুর্ভাবের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সবই জাইরে ধরনের ছিল। ভিন্ন ধরনের ভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও জটিল হবে। কারণ বর্তমানে ব্যবহৃত চিকিৎসা ও টিকা জাইরে ধরনের বিরুদ্ধে তৈরি করা হয়েছে।’
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বলেছে, বুনিয়া ও রুয়াম্পারার নগর পরিবেশ, ব্যাপক জনচলাচল এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোর খনিশিল্পকেন্দ্রিক যাতায়াতের কারণে ভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এলাকাগুলো উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত।
সংস্থাটির মহাপরিচালক জ্যঁ কাসেয়া বলেন, ‘আক্রান্ত অঞ্চল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক জনচলাচল থাকায় দ্রুত আঞ্চলিক সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।’
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বান্ডিবুগিও ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত এক কঙ্গোলিজ নাগরিক রাজধানী কাম্পালায় মারা গেছেন। ওই রোগী কঙ্গো থেকে এসেছিলেন এবং এখন পর্যন্ত দেশটিতে স্থানীয়ভাবে কোনো সংক্রমণ নিশ্চিত হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা ৫ মে ইবোলার সন্দেহভাজন সংক্রমণের খবর পাই এবং তদন্তে সহায়তার জন্য ইতুরিতে একটি দল পাঠাই। তবে মাঠপর্যায়ে সংগ্রহ করা নমুনাগুলো প্রথমে পরীক্ষায় সংক্রমণের তথ্য মেলেনি (নেগেটিভ)।’
পরে কিনশাসার একটি পরীক্ষাগারে বৃহস্পতিবার নমুনাগুলো সংক্রমিত নমুনা (পজিটিভ) হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।
তেদ্রোস বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মোট ১৩টি সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি তহবিল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৫ লাখ ডলার ছাড় করেছে।’
এ অর্থ নজরদারি, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, পরীক্ষাগার পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় ব্যয় করা হবে বলেও জানান তিনি।
নতুন এ প্রাদুর্ভাব এমন সময়ে দেখা দিল, যখন ইতুরি প্রদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। ওই সংঘাতের কারণে মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসাসংস্থা মেডসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের এ মাসের শুরুতে জানিয়েছিল, প্রদেশটির বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হয় অকার্যকর হয়ে পড়েছে, নয়তো অতিরিক্ত রোগীর চাপে ভেঙে পড়ছে।
সংস্থাটি বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যবিধি সংকটের কথা উল্লেখ করে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছে।
১৯৭৬ সালে প্রথম ইবোলা শনাক্ত হওয়ার পর এটি কঙ্গোতে ১৭তম প্রাদুর্ভাব। সবশেষ কাসাই প্রদেশে গত অক্টোবরে ইবোলা প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর গত ১ ডিসেম্বর শেষ ঘোষণা করা হয়। সেখানে মোট ৬৪টি সংক্রমণের মধ্যে ৪৫ জন মারা যান এবং ১৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
ইবোলা একটি মারাত্মক এবং প্রায়ই প্রাণঘাতী রোগ, যা কঙ্গোর বিস্তীর্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানিয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল, দূষিত বস্তু অথবা রোগে মৃত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে ভাইরাসটি ছড়ায়।


