ওজন কমলেই যে শরীরের মেদও কমছে, এমন ধারণা সব সময় সঠিক নয়। আবার ওজনে তেমন পরিবর্তন না ঘটলেও শারীরিক মাপজোকে অনেক সময় মেদ কমার প্রমাণ মেলে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বেশিরভাগ সময় কয়েক দিনের মধ্যে দ্রুত ওজন কমে গেলে তা শরীরের পানি ও সঞ্চিত শক্তির পরিবর্তনের কারণে ঘটে থাকে। বিশেষ করে দৈনন্দিন খাবারে শর্করা বা লবণের পরিমাণ কমালে শরীরে পানির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে, যার প্রভাব ওজন মাপার যন্ত্রে দেখা যায়।
বাড়তি ওজন কমানোর চেষ্টায় থাকা অনেকেই দাঁড়িপাল্লায় সেই ঘাটতি দেখে খুশি হয়ে যান। তবে তারা ভুলে যান, কম ওজন মানেই শরীরের চর্বি কমে যাওয়া নয়। দেহের ওজন পানি, সঞ্চিত শক্তি, খাবারের পরিমাণ এমনকি হজম ও মলত্যাগের পরিবর্তনের কারণেও ওঠানামা করতে পারে।
যারা প্রকৃতপক্ষে শরীরের মেদ কমাতে চান, তাদের জন্য শুধু ওজনের দিকে তাকিয়ে থাকা যথেষ্ট নয়। শরীরের গঠন, মাপ, শক্তি ও বাহ্যিক পরিবর্তনের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নিচের পাঁচটি লক্ষণ থেকে বোঝা যায়, শরীরের ওজন কমার পাশাপাশি আসলে মেদ কমছে কি না।
কোমরের মাপ
কোমর বা পেটের মাপ কমে যাওয়া শরীরের মেদ কমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। ওজনের পরিবর্তন খুব বেশি না হলেও যদি একই মাপের প্যান্ট, পায়জামা বা জিনস কোমরের কাছে ঢিলেঢালা হয়ে যায়, তাহলে তা পেটের চর্বি কমার ইঙ্গিত হতে পারে।
কারণ শরীর মেদ ঝড়িয়ে সে স্থলে পেশি ধরে রাখতে সক্ষম। এক কেজি মেদ এবং এক কেজি পেশির আয়তন, আকার অবশ্যই ভিন্ন। ওজনের সংখ্যা খুব বেশি পরিবর্তন না হলেও মেদ ঝড়ানোয় অনেকেই সফল হতে পারেন। তাই এক বা দুই সপ্তাহ পরপর একই ধরনের পরিস্থিতিতে কোমরের মাপ নেওয়া শরীরের পরিবর্তন বোঝার জন্য বেশি কার্যকর।
কোমরের মাপ ধীরে ধীরে কমার সঙ্গে যদি পেশির শক্তি একই থাকে বা বাড়ে, তাহলে তা শরীরের গঠনে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পোশাকে ফিট হওয়া
অনেক সময় ওজন মাপার যন্ত্রে তেমন পরিবর্তন দেখা না গেলেও পোশাকের ফিটিংয়ে পরিবর্তন আসে। জামা, প্যান্ট বা এমন কোনো পোশাক যা আগে গায়ে লাগতো না তাতে ফিট হওয়া কিংবা অন্য পোশাক আগের তুলনায় ঢিলেঢালা লাগলে তা শরীরের মেদ কমার ইঙ্গিত দিতে পারে।
একই ওজন হলেও মেদ পেশির তুলনায় বেশি জায়গা দখল করে। ফলে শরীরের গঠনে পরিবর্তন এলে তা অনেক সময় ওজন মাপার মেশিনে ধরা পড়ার আগে পোশাকের মাধ্যমে বোঝা যায়।
দৈহিক পরিবর্তনে মেদ কমার প্রমাণ
কোমরের পাশাপাশি নিতম্ব, বুক ও উরুর মতো জায়গায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে বুঝতে হবে শরীরের চর্বির পরিমাণ কমছে। যারা শরীরচর্চার সঙ্গে যুক্ত এবং পরিমিত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য শক্তি ধরে রাখা বা ওজন বাড়তে থাকা একটি ভালো লক্ষণ। কারণ এতে বোঝা যায়, মেদ কমাতে গিয়ে মাংস পেশি নষ্ট হচ্ছে না।
যেমন একই ওজন নিয়ে একই ব্যায়াম আরও বেশি বার করতে পারা বা ধীরে ধীরে ভারী ওজন তুলতে সক্ষম হওয়া, একই সঙ্গে কোমরের মাপ কমে যাওয়া- শরীরের গঠনে উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।

তবে শরীরের এই শক্তি সক্ষমতার মাত্রা ঘুম, খাবার, মানসিক চাপ ও শরীরচর্চার অভিজ্ঞতার মতো বিভিন্ন বিষয়ের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু শক্তির ওপর নির্ভর না করে অন্য লক্ষণের সঙ্গেও মেদ কমার বিষয়টি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শরীরে মেদের স্তর কমতে থাকলে পেশির গঠন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কাঁধ, বাহু, বুক, পেট ও পায়ের পেশিতে আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
দৃশ্যমান পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রমাণ পাবেন যেভাবে
শরীরের আকৃতি আরও সুগঠিত হওয়া, কোমরের গঠন পরিষ্কার হওয়া বা পেশির বিভাজন স্পষ্ট হওয়া মেদ কমার স্পষ্ট লক্ষণ। এই পরিবর্তন বোঝার জন্য কয়েক সপ্তাহ পরপর একই জায়গায়, একই ধরনের আলোতে, একই ধরনের পোশাক ও একই ভঙ্গিতে ছবি তুলে রাখা যেতে পারে। তবে ভিন্ন আলো, শরীরের ভঙ্গি, পানির পরিমাণ বা খাবারের সময়ের কারণে শরীর সাময়িকভাবে বেশি বা কম সুগঠিত দেখাতে পারে।
দ্রুত নয় বরং ওজন ধীরে ধীরে কমা প্রকৃত মেদ কমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। কয়েক দিনের মধ্যে ওজন দ্রুত কমে গেলে তা আবার দ্রুত বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শর্করা বা লবণ কম খেলে শরীর থেকে পানি কমে যায়, ফলে ওজন দ্রুত কমে যেতে পারে। কিন্তু প্রকৃত শরীরের চর্বি কমার প্রক্রিয়া সাধারণত ধীরে ঘটে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে যদি গড় ওজন ধীরে ধীরে কমে এবং একই সঙ্গে কোমরের মাপও কমে, তাহলে তা শরীরের মেদ কমার আরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
তাই প্রতিদিনের ওজনের ওঠানামা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রবণতার দিকে নজর দেওয়া বেশি কার্যকর।
ওজন কমানো নাকি মেদ কমানো-লক্ষ্য কোনটি?
শুধু ওজনের সংখ্যা কমানোই শরীর সুস্থ করার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরের গঠন উন্নত করা।
ওজন কমার গতি ধীর হলেও কোমরের মাপ কমা, পোশাক ভালোভাবে মানানো, শক্তি ধরে রাখা এবং শরীরের গঠন আরও স্পষ্ট হওয়া- এসব পরিবর্তন দেখালে বুঝতে হবে শরীর ইতিবাচকভাবে বদলাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্রুত ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত খাবার কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়। দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণ, নিয়মিত পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধারাবাহিকতা।
এভাবেই শরীরের মেদ কমানো সম্ভব হয় এবং একই সঙ্গে শরীরের প্রয়োজনীয় পেশিও ধরে রাখা যায়।


