হরমুজ প্রণালিতে ইরান তিন জাহাজে হামলার পর এবার এশীয় সমুদ্রসীমায় দেশটির পতাকাবাহী তিনটি তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি সমুদ্র থেকে আটকের পর জাহাজগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ আটকের এই পদক্ষেপ দুই দেশের কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উস্কে দিতে পারে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অন্তত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এর মধ্যে আংশিকভাবে অপরিশোধিত তেল বোঝাই অবস্থায় বড় একটি জাহাজকে সপ্তাহখানেক আগে মালয়েশিয়ার উপকূলে দেখা গিয়েছিল।
আরেকটি অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজ, যার সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০ লাখ ব্যারেল, সেটি প্রায় ৬৫ শতাংশ তেল বহন করছিল। সেটিকেও আটক করা হয়েছে এবং ওই জাহাজটিকেও এক মাস আগে সবশেষ মালয়েশিয়ার উপকূলে দেখা যায়।
তৃতীয় জাহাজটি একটি বড় তেলবাহী জাহাজ, যা প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বোঝাই ছিল। এটি সবশেষ তিন দিন আগে ভারতের দক্ষিণ উপকূলের কাছে দেখা যায়।
মার্কিন সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, এই জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ সেটিকে পাহারা দিচ্ছে।
আরও একটি ইরানি জাহাজ আটক করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বিষয়ক সংস্থা কেপলার। এটি ভারতে তেল খালাসের অপেক্ষায় থাকলেও সম্ভবত সেটি করতে পারেনি, কারণ ইরানি তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশেষ অনুমতি ছিল, তা গত রোববার শেষ হয়ে গেছে। এই জাহাজটিকে শেষবার ভারতের পশ্চিম উপকূলে দেখা যায়।
মার্কিন কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের দাবি, ইরানি বন্দরে অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা মোট ২৯টি জাহাজকে ফিরে যেতে বা ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে। তবে তারা এখনো সব জাহাজের তালিকা প্রকাশ করেনি।
নিরাপত্তা সূত্রের মতে, মার্কিন বাহিনী ইরানের জাহাজগুলোকে জলপথের সংকীর্ণ অংশের পরিবর্তে খোলা সমুদ্রে লক্ষ্যবস্তু করতে চাইছে। এর কারণ, ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ভাসমান মাইন থাকার সম্ভাবনা থাকায় অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এর আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করায় অন্তত তিনটি জাহাজে হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এর মধ্যে দুটি জাহাজকে তারা জব্দ করেছে।
আইআরজিসির নৌবাহিনীর বিবৃতির বরাত দিয়ে ইরানের সংবাদমাধ্যম বলেছে, এমএসসি ফ্রান্সেসকা এবং এপামিনোন্ডাস নামের দু’টি জাহাজকে ‘জব্দ’ করা হয়েছে। ওই দুই জাহাজ বর্তমানে ইরানের উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বন্দরে অবরোধ অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, ইরান পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল ঠেকাতে গুলি চালানোর মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই প্রণালিতে থাকা জাহাজে প্রথম গুলি চালানোর ঘটনা।
এতে দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে ‘যুদ্ধবিরতি’ থাকলেও শান্তি আলোচনা আবার শুরু হওয়ার তেমন কোনো লক্ষণ নেই।
এই সংঘাতের কারণে হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে, তৈরি হয়েছে জ্বালানি সংকট।


