কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের অন্ধকার জগতের গোপন নথি বা ‘এপস্টেইন ফাইলস’ জনসমক্ষে আসতেই বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
তবে সবচেয়ে চমকে ওঠার মতো বিষয় হলো, এই নথির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী এবং স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে এই বিতর্কিত ফাইলে, যা এখন নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
এপস্টেইন ফাইলসের সবচেয়ে রহস্যময় অংশটি হলো ২০১০ সালের একটি ইমেইল বার্তা। সেখানে দেখা যায়, এক অজ্ঞাতনামা নারীর সঙ্গে এপস্টেইনের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হচ্ছে। ওই নারী সাফ জানিয়ে দেন, তিনি কোনোভাবেই যৌন ব্যবসার দালাল বা মেয়ে সরবরাহকারী হতে পারবেন না।
এই বিতর্কের মাঝেই হঠাৎ করে এপস্টেইন বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে কলেরা নিয়ে তিনি কাজ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেখানে আশানুরূপ ফল পাননি। একজন যৌন অপরাধীর ইমেইলে বাংলাদেশের কলেরা প্রজেক্টের প্রসঙ্গ কেন আসল, কিংবা সেই রহস্যময়ী নারী কি বাংলাদেশি ছিলেন কি না, তা নিয়ে এখন গভীর রহস্য দানা বেঁধেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এপস্টেইন হয়তো বাংলাদেশের কোনো প্রজেক্টকে তার অপকর্মের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।
এই নথিতে বিশেষভাবে উঠে এসেছে শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। ইমেইল রেকর্ড অনুযায়ী, ইসাবেল নামের এক নারী মুহাম্মদ ইউনূসকে বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ম্যাট গ্রোনিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে একটি কার্টুন চরিত্র তৈরি করা। পরবর্তীতে সেই কার্টুনটি তৈরি করে এপস্টেইনের কাছে পাঠানো হয় এবং ইমেইল প্রেরক একে একটি বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
শুধু তাই নয়, এপস্টেইনের নথিতে গ্রামীণ হেলথ ইনোভেশন সংক্রান্ত একটি আলাদা পিডিএফ ফাইলও পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এপস্টেইন সংশ্লিষ্টরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
তালিকায় আরও নাম এসেছে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টুর। নথির তথ্যমতে, তিনি সাবেক মার্কিন গভর্নর বিল রিচার্ডসনের নির্বাচনী প্রচারণায় পাঁচ হাজার ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। এই বিল রিচার্ডসনের সঙ্গে জেফরি এপস্টেইনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্র ধরেই মিন্টুর নাম এই বিতর্কিত ফাইলে জায়গা করে নিয়েছে।
আর্থিক খাতের সংযোগ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের জনপ্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘বিকাশ’-এর নামও এখানে জড়িয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে চাওয়া বিল গেটস এর পৃষ্ঠপোষকতায় এপস্টেইনের বিনিয়োগ দলের সদস্য জুলি সান্ডারল্যান্ড বিকাশের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করেছিলেন। এমনকি বিকাশের সিইও কামাল কাদিরের ডিজিটাল ফাইন্যান্স সংক্রান্ত একটি রিপোর্টও পাওয়া গেছে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত ফাইলে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআরবিকে কেন্দ্র করে একটি লাভজনক সরকারি-বেসরকারি গবেষণা উদ্যোগের প্রস্তাবও সেখানে ছিল। ওই প্রস্তাবে ৩ শতাংশ নিশ্চিত লাভ এবং যুক্তরাষ্ট্রে করছাড়ের সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
রেকর্ড বলছে, ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি এপস্টেইনের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বাংলাদেশ ও ভারত সফর করেন।
কুখ্যাত এই ব্যক্তির নথিতে বাংলাদেশের এতসব নাম ও প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি কি কেবলই ব্যবসায়িক সংযোগ, নাকি এর আড়ালে আরও কোনো অন্ধকার সত্য লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।
উল্লেখ্য, এই ফাইলগুলোতে কেবল বাংলাদেশের নামই নয়, ইলোন মাস্ক, বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটিশ প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং রিচার্ড ব্র্যানসনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিদের নামও রয়েছে। এপস্টেইন ফাইলস জনসমক্ষে আসলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা এই রহস্যগুলো হয়তো আরও দীর্ঘকাল অমীমাংসিতই থেকে যাবে।


