জুলাই বিপ্লবের সময় ব্যাপক এবং বিস্তৃত পরিসরে হত্যার সঙ্গে জড়িত ও নির্দেশদাতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যই ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের ক্ষেত্রবিশেষে যেমন আসামি করা হচ্ছে না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামি না করে বরং সাক্ষী করার অভিযোগ উঠেছে।
যেমন, গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার চানখারপুল এলাকার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গুলির নির্দেশদাতা পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। আবার রামপুরার হত্যাকাণ্ডে সেনা কর্মকর্তারা আসামি হলেও, সেই ঘটনায় জড়িত ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. হায়াতুল ইসলাম খানকে মামলায় আসামিই করা হয়নি। এমনকি, আন্দোলনকারী এক নারী শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ থাকলেও আইনের হাত থেকে ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার জাবেদ ইকবাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে চানখাঁরপুল মোড়ের একটি স্পটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন উপ-পুলিশ পরিদর্শক মো. আশরাফুল ইসলাম। সেখানে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে, শুয়ে ও হাঁটু গেড়ে বসে গুলি করেছে। এখানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফ টিম লিডার হিসেবে হত্যার নির্দেশ দেন। অধস্তন পুলিশ সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত করেন, তাগিদ দেন। ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি ও নির্দেশনার প্রমাণ বেসরকারি একটি টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। প্রসিকিউশন বিষয়টি জানে, তবু তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রসিকিউশনের প্রভাবশালী সদস্য অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলামের সক্রিয় হস্তক্ষেপে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাক্ষী করা হয়েছে, উদ্দেশ্য; সাক্ষী হলে হত্যাকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আড়ালে থেকে যাবে, তিনি সহানুভূতি পাবেন। এরপর, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় ৩৯তম সাক্ষী হিসেবে তিনি সাক্ষ্য দেন। এই মামলার রায়ে গত বছরের ১৭ নভেম্বর হাসিনা ও তার দুই সহযোগীর সাজা হয়েছে। এর আগে, ৮ সেপ্টেম্বর ৩৯তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আশরাফুল ইসলাম। প্রসিকিউটর মিজান ও পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়, রাজশাহীতে।
সূত্র মতে, চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে, প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী এমএইচ তামিমের কক্ষে এসআই আশরাফকে একদা মারতে উদ্যত হয়েছিলেন প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ। তখন তামিম ও মিজানসহ কয়েকজন প্রসিকিউটর সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় প্রসিকিউশন অফিস থেকে হালকা বকাঝকা করে আশরাফকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর, হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দেন সেই পুলিশ কর্মকর্তা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে, সরাসরি নির্দেশদানকারী ব্যক্তিকে, হত্যা মামলায় সাক্ষী বানানোর ছলে হত্যার দায় বা অভিযোগ থেকে ছাড় দেওয়া শুধু বেআইনিই নয়; নৈতিকতা ও যৌক্তিকতাবিরোধীও। তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন; সেই মামলায় হত্যাকাণ্ডে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি বা ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে নির্দেশের দায় বর্তানোর অভিযোগ ছিল। হাসিনার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ বিচারে প্রমাণিতও হয়েছে। অথচ, এই একই অভিযোগ পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, তিনিও তার অধিক্ষেত্রের জন্য দায়ী; অধস্তন পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশের পরে গুলি ছোঁড়া হয়েছে। তার নির্দেশ পালন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি হয়েছেন পুলিশ কনস্টেবল মো. নাসিরুল ইসলাম ও মো. সুজন হোসেন। আর হত্যার নির্দেশ দিয়েও মামলার সাক্ষী হয়ে, তিনি রেহাই পেয়ে গেছেন, এটি দৃষ্টিকটূ।
দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা উদ্ধৃত করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একই উদ্দেশ্যে অপরাধ করলে, তাদের মধ্যে কেউ কম বা কেউ বেশি অপরাধ করলেও; সবাই সমানভাবে দায়ী হবে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ ওই অপরাধে মোটেও অংশগ্রহণ না করলেও, সে সমানভাবে দায়ী হবে। এক্ষেত্রে কেউ সহায়তাকারী বা কেউ প্ররোচনাকারী হিসেবে দায়ী হবে না। প্রত্যেকে মূল অপরাধের জন্য দায়ী হবে। ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ধারাতেও অনুরূপ কথা বলা হয়েছে।
জবানবন্দিতে কী আছে?
জবানবন্দিতে আশরাফুল জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে তিনি চানখারপুল এলাকায় ডিউটিতে ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিলো সেদিন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, চানখাঁরপুল এলাকায় ছাত্র-জনতাকে গুলি করার নির্দেশ দেন পুলিশের রমনা অঞ্চলের তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। অধস্তন পুলিশ সদস্যদের আখতার বলেন, তোমাদের মধ্যে যাদের কাছে পিস্তল ও চায়না রাইফেল আছে, তারা ফায়ার (গুলি) করে আন্দোলনকারীদের মেরে ফেলো।
সাক্ষী জানান, তখন তিনিসহ আরো কয়েকজন এই অপ্রয়োজনীয় ও অবৈধ আদেশ পালন করেননি। এতে তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন আখতার। চাকরিচ্যুতিরও হুমকি দেন। তবু এসআই আশরাফ নিজের পিস্তল থেকে ফায়ার করেননি। পরে কনস্টেবল নাসির এডিসির সরবরাহ করা অতিরিক্ত গুলি ব্যবহার করে; তার নির্দেশে ও দেখানো মতে চায়না রাইফেলে গুলি লোড করে এবং আন্দোলনকারীদের টার্গেট করে বারবার ফায়ার করে। এ সময় এডিসি আখতার এপিবিএন পুলিশের কনস্টেবল অজয়ের হাত থেকে চায়না রাইফেল কেড়ে নিয়ে এপিবিএন কনস্টেবল সুজনের হাতে দেন। সুজন চানখারপুল মোড়ে কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো শুয়ে, কখনো হাঁটু গেড়ে বসে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। এপিবিএনের কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমনও চায়না রাইফেল দিয়ে আন্দোলনকারীদের দিকে গুলি করেন।
আশরাফ বলেন, আমি দেখতে পাই এরূপ গুলিতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যায় এবং অন্য আন্দোলনকারীরা তাদের নিয়ে যাচ্ছে। এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদ এপিবিএনের ৫/৭ জন সদস্য নিয়ে নাজিমুদ্দিন রোডের বিভিন্ন গলিতে গুলি করতে করতে প্রবেশ করলে আমরা চায়না রাইফেলের গুলির শব্দ শুনি। হাসিনার পলায়নের খবর শুনতে পেয়ে দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে চানখারপুল এলাকার পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ভিডিও কথা বলে
চানখারপুল এলাকার শেখ বোরহানউদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ ও মেট্রোপলিস কলেজের সামনে গোলাগুলি হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এখানে ডিএমপি ও এপিবিএন পুলিশ ছিলো। হাঁটু গেড়ে একজন এপিবিএন পুলিশকে গুলি করতে দেখা যায়। তার নাম সুজন।
এরপর, দৃশ্যপটে আসেন এসআই আশরাফুল ইসলাম। মুখে চাপ দাড়ি, দাড়িতে মেহেদীর রঙ লাগানো। মাথায় হেলমেট। তিনি এখানে, অধস্তন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। মুখে মাস্ক পরা একজন পুলিশ সদস্যকে তিনি সামনে ঠেলে দেন, গুলি করতে। ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে দেন, গুলি করতে। আঙুল দিয়ে দিকও নির্দেশ করেন, গুলি করতে। ওই পুলিশ সদস্য এগিয়ে যান, অস্ত্র তাক করেন। তিনি কনস্টেবল নাসির। হাঁটু গেড়ে বসেন, গুলি করেন। এ সময় টিম থেকে একজন বলেন, মরছে, একটা মরছে। টিম লিডার আশরাফ বলেন, মার্।
একটু পিছিয়ে আসেন তিনি। গুলি চলতে থাকে। আশরাফ আবার বলেন, মার্। মার্।
এপিবিএনের যে সদস্য হাঁটু গেড়ে গুলি করেছিলেন, তিনি এবার উপুর হয়ে মাটিতে শুয়ে গুলি করতে শুরু করেন। তার সঙ্গে যোগ দেন অন্য দুই পুলিশ। একজন ডিএমপির পোশাকে, অন্যজন এপিবিএনের সদস্য। তারা গুলি করেন হাঁটু গেড়ে।
এই স্পট থেকেই আবাসিক ভবনের দিকেও গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। অনতিদূরে ফ্লাইওয়ার। ফ্লাইওয়ারের পাদদেশে একজনকে চিত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়; হয়তো আহত হয়ে সংজ্ঞাহীন, অথবা লাশ। একটু দূরে জনতা; পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ছে। এই ঘটনা একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সেই ভিডিও বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া যায়।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদায় নিযুক্ত প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. মিজানুল ইসলাম। বিগত দুইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীদের নেতাদের যখন বিচার হচ্ছিল, এই মিজানুল ছিলেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। হত্যার নির্দেশদাতাকে সাক্ষী করার মাধ্যমে মামলা থেকে রেহাই দেওয়া প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি এ বিষয়ে টাইমসকে বলেন, এ ধরনের কোনো কমপ্লেন আমাদের কাছে নেই। হত্যার ঘটনায় কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলে, সাক্ষী হওয়ার কারণেই আইনের হাত থেকে সে বেঁচে যাবে, এমন কোনো কথা নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে, তার বিরুদ্ধে নতুন মামলা হতে আইনগতভাবে কোনো বাধা নেই। কারণ, একটি ঘটনায় একাধিক মামলাও হতে পারে।
আপনার হস্তক্ষেপে এসআই আশরাফকে সাক্ষী করা হয়েছে, এমন অভিযোগের জবাবে মিজানুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘এ রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। এই ভদ্রলোক আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসার আগের দিন পর্যন্ত তাকে আমি কোনো দিন দেখিনি। তিনি যে এলাকার বাসিন্দা, সেখানে আমি জীবনেও কোনো দিন যাইনি। আমি তো রাজশাহীর অনেক মামলাই করেছি।’
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষার টাইমসকে বলেন, কেউ গুলি করা ও গুলির নির্দেশদাতা হয়ে থাকলে, তাকে আসামি না করা বা সাক্ষী করাটা ন্যায়বিচার পরিপন্থী। এতে আইন-আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না। কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্ত করে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ আইন সমিতির আহবায়ক, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনির হোসেন টাইমসকে বলেন, হত্যা মামলায় হত্যার নির্দেশ সংক্রান্ত মূল আসামির নির্দেশে তার কোনো অধস্তন ব্যক্তি নিরীহ জনগণকে বিনা অপরাধে, অমানবিক ও বেআইনিভাবে হত্যার নির্দেশ দিলে, ওই ঊর্দ্ধতন ও অধস্তন ব্যক্তিই নির্দেশ দিয়েছেন বলে গণ্য হবে। এই নির্দেশ অনুসারে যদি ওই অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে ঊর্দ্ধতন ও অধস্তনসহ যারা নির্দেশ পালন করেছেন, সবাই সমানভাবে ও এককভাবে ওই অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী হবেন। এবং সকলেই সমানভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ঊর্দ্ধতন ব্যক্তিকে ওই অপরাধে অভিযুক্ত করা হলে, তার নির্দেশ পালন করার কারণে, অধস্তন ব্যক্তিকেও ওই অপরাধে অভিযুক্ত করা হবে। এ ধরনের ব্যক্তিকে আদালত চাইলে রাজসাক্ষী হওয়ার অনুমতি দিতে পারে, কিন্তু; এর আগে অবশ্যই তাকে আসামি হতে হবে। সরাসরি তাকে সাক্ষী করা যায় না।
এদিকে আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হক ও শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে অর্থের বিনিময়ে রাজসাক্ষী বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফেসবুকে এমন অভিযোগ করেছেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। হাসিনা মৃত্যুদণ্ড পেলেও, আসামি মামুন রাজসাক্ষী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আশুলিয়ার মামলায় আবজাল ক্ষমা পান, অন্যরা মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।
প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের দাবি, বিচার চলাকালে আবজালের স্ত্রীকে ‘ভারী ব্যাগ’ (টাকা) নিয়ে প্রসিকিউটর তামিমের রুমে ঢুকতে দেখা গেছে। তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে বিষয়টি জানানো হলেও তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেননি।
তবে তাজুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি টাইমসকে বলেন, সংশ্লিষ্টরা রাজসাক্ষী হয়ে বিচারে সহযোগিতা করেছেন। আদালত তাদের শাস্তি দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবজালের স্ত্রীর বিষয়টির তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া যায়নি। অর্থের বিনিময়ে রাজসাক্ষী করেছি, এমন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না, আমি চ্যালেঞ্জ করছি। আমার নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন টিমের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো স্বচ্ছ ও আইনানুগ। এতোদিন পরে এসে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিদ্বেষপ্রসূত, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মিথ্যা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা মাত্র।
অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থানের সময় ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন হায়াতুল ইসলাম খান। আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তিনি ফোনে কথা বলেন, যার অডিও রেকর্ড টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে এসেছে। সেই কথোপকথনে তিনি দুদিক থেকে ঘেরাও করে রামপুরায় আন্দোলনকারীদের গুলি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। জবাবে ডিএমপি কমিশনার একমত পোষণ করেন।
বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার থেকে সেই বক্তব্যের অডিও রেকর্ড জব্দ করেন। অডিওর ব্যাপ্তি ৫০ সেকেন্ড। বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে হায়াতুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিব চানখারপুলের মামলায় আসামি হয়েছেন, বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রামপুরার ওই ঘটনায় অন্তত ২৮ জন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছে। সেই মামলায় সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মো. রাফাত-বিন-আলম আসামি হয়ে কারাগারে আছেন। অথচ, মতিঝিলের ডিসি হায়াতুলকে আসামি করা হয়নি। এমনকি জব্দকৃত অডিও রেকর্ডের ফরেনসিকও করা হয়নি।
অডিওর বিষয়ে তানভীর হাসান জোহার কাছে টাইমসের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই হায়াতুল ইসলাম খান পুলিশে চাকরির শুরুতে তদন্ত সংস্থার সহসমন্বয়ক, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ চৌধুরীর অধীনে প্রবেশনারি অফিসার ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট হায়াতুলকে বদলি করে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করে তৎকালীন অন্তবর্তীকালীন সরকার।
হায়াতুল ইসলাম খানের বিষয়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের তদন্ত কার্যক্রম চলছে, আমরা কাউকে অভিযোগ থেকে ছাড় বা অব্যাহতি দিইনি। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে, প্রসিকিউশনে লোকবল কম। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। তবে, কাউকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।’
জুলাই বিপ্লবের সময় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) ছিলেন জাবেদ ইকবাল। তার গ্রামে বাড়ি খুলনাতে। রাজধানীর উত্তরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে আছেন। গত মার্চে ট্রাইব্যুনালের অনুমতিক্রমে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী, যিনি গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন; সেই আন্দোলন চলাকালে, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই; তাকে উত্তরা পশ্চিম থানায় ডেকে নিয়ে বাবা-মাসহ কয়েকজনের সামনে শ্লীলতাহানি করেন এসি জাবেদ। এবং পিস্তল দিয়ে ভয় দেখান, হুমকি দেন। ওই ছাত্রী পরে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার কাছে এর বিচার দাবি করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এর বিচার হতে পারে। প্রসঙ্গত, তদন্ত সংস্থার পাশাপাশি প্রসিকিউশনেরও তদন্ত ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জাবেদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার একটি প্রভাবশালী অংশ। এবং এই বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাদের মতে, দণ্ডবিধিতে এর বিচার হতে পারে, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারের দরকার নেই। বাগেরহাটের অধিবাসী, প্রসিকিউটর তামিম টাইমসকে বলেন, জাবেদ ইকবালের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ নেই। একজন নারী শিক্ষার্থী এক পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছে, ইকবালের বিরুদ্ধে নয়। অঞ্চলপ্রীতির কারণে তাকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নে তামিম বলেন, ‘তার বাড়ি খুলনায়, আমার বাড়ি বাগেরহাটে। তিনি আমার এলাকার হলে তো পুরো বাংলাদেশই আমার এলাকা।’
অবশ্য, এর আগে গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউটর তামিম গণমাধ্যমে জানান, জুলাই গণআন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় হত্যাকাণ্ডে জাবেদ ইকবালের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে আরামবাগ এলাকায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকেও বেধড়ক পিটিয়েছেন এই জাবদ ইকবাল। শেখ হাসিনার পতনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহসহ ছয় সমন্বয়ককে ডিবিতে তুলে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে ছিলেন জাবেদ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর র্যাবে সংযুক্ত করা হলেও গত বছরের ১৫ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তৎকালীন অন্তবর্তীকালীন সরকার।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলার রায় হয়েছে, সেগুলোতে কোনো অনিয়ম থাকলে, সে বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আমি বিষয়টি পর্যালোচনা করবো, ফরমাল চার্জগুলো যথাযথ হয়েছে কিনা, ইনভেস্টিগেশনগুলো যথার্থ হয়েছে কিনা, সবকিছু দেখবো। যদি কোনো বিষয়ে আমার কাছে মনে হয় যে, তদন্ত যথাযথ হয়নি, তাহলে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব।


