একুশে ফেব্রুয়ারি, বাঙালি স্মৃতির আবেগঘন দিনটি বছর ঘুরে ফিরে এসেছে আবার। ছোটবেলা থেকে দেখে আসা এই দিনটি, একদিকে যেমন মনে করায় শ্রদ্ধা, অন্যদিকে এক অদ্ভুত উৎসবমুখর বিষণ্নতা।
ঢাকায় বড় হওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের কাছে দিনটি শুরু হতো প্রভাতফেরীর গান দিয়ে। মহল্লার মোড়ে মোড়ে মাইক বেঁধে বাজতে থাকত ভাষা শহিদদের স্মরণে, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…”।
ভোরের আলো ফুটতেই এলাকার শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, আর বেলা গড়ালেই বাবা-মায়ের হাত ধরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এ যাওয়া। আর সেখানে পৌঁছেই মনে হতো যেন পুরো দেশ এক জায়গায় এসে জমেছে। কেউ বিক্রি করছে বেলুন, কেউ এক গালে এসে এঁকে দিচ্ছে শহীদ মিনারের ছবি, অন্য গালে অ আ ক খ। কপালে বেঁধে দেওয়া “২১ ফেব্রুয়ারি” লেখা কাপড়। যেন শিশুমনে অজান্তেই ঢুকে যাচ্ছে ইতিহাসের প্রথম পাঠ।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দিনটি ধীরে ধীরে রূপ নিত এক বিশেষ পারিবারিক ভ্রমণে। বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে শহীদ মিনার থেকে দোয়েল চত্বর পেরিয়ে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনের “অমর একুশে বইমেলা”য় যাওয়া। তখন বই মেলা মানেই ছিল শুধু এই এক জায়গা-ই। একাডেমীর সামনের রাস্তায় ছিল না আজকের মতো উঁচু মেট্রোর পিলার। খোলা আকাশের নিচে রাস্তার দু’ধারে বসত খেলনা, বাঁশি, মুখোশ, হাওয়াই মিঠাই, কিছু ছড়ানো ছিটানো বই আর রঙিন বেলুনের দোকান। সন্ধ্যার কমলা আকাশের নিচে হাঁটতে হাঁটতে বইমেলায় ঢোকার সেই অনুভূতি ছিল যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করার মতন। হাওয়াই মিঠাই খেতে খেতে বই মেলার এক স্টল থেকে অন্য স্টলে দৌড়োদৌড়ি। হাতে বই ভরা ব্যাগ আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে শেষ হতো ফেব্রুয়ারির এই দিনটি দিনটি।
তবে ঢাকার এই স্মৃতির বিপরীতে দেশের ছোট শহর বা মফস্বলের একুশ ছিল আরও ঘরোয়া, আরও আত্মীয়তাপূর্ণ। রাজবাড়ীতে বড় হওয়া জুয়েলের কাছে একুশ মানেই ছিল নিজের হাতে বানানো আয়োজন। শহর থেকে কিছুটা দূরে, রেলস্টেশন থেকে কয়েক মিনিট দুরত্বের এলাকায় বড় হয়ে ওঠা জুয়েল দেখেছেন সরকারি স্কুল ছাড়া কোথাও স্থায়ী শহীদ মিনার নেই। তাই ২০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকেই শুরু হতো প্রস্তুতি। কোথাও থেকে ইট, কোথাও থেকে কাঠ জোগাড় করে বানানো হতো অস্থায়ী মিনার; গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে আনা হতো পুষ্পাঞ্জলির জন্য। বাসা থেকে এক মুঠো চাল, এক মুঠো ডাল এনে পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে রান্না করা হতো খিচুড়ি। বিকেলে বাজারের মেলায় ঘুরতে ঘুরতে মাইকে বাজত সেই একই গান, যা ঢাকায় শোনা যেত, কিন্তু এখানে তা যেন আরও কাছের, আরও ব্যক্তিগত। চাকরিসূত্রে এখন ঢাকায় থাকলেও প্রতি বছর একুশ এলে জুয়েল ফিরে যান সেই ছোট্ট শহরের উঠোনে, যেখানে আয়োজন ছিল সামান্য, কিন্তু স্মৃতি ছিল বিপুল।
এদিকে গ্রামীণ বাংলায় এই দিন যে কতটা আবেগের ছিল তাই ফুটে ওঠে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় বেড়ে ওঠা রিতুর কণ্ঠে। তখন তিনি রাধাকান্ত উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী। একুশ মানেই তখন তার বুকের ভেতর অকারণ কাঁপন। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করতেন, ভাষা শহিদদের ঋণ শোধ করার দায়িত্ব সবার। তাই রাত ১২টা ১ মিনিটে কলাগাছ কেটে বানানো অস্থায়ী শহীদ মিনারের সামনে জড়ো হতো মানুষ। গভীর প্রতীকী অর্ঘ্য দিতে কেউ কেউ আঙুল ফুটিয়ে রক্ত দিত সেই কলাগাছের মাথায়। কুয়াশাভেজা রাত, ঘুমচোখে শিশু, মায়ের হাত শক্ত করে ধরা এসব মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে উঠত আজীবনের স্মৃতি। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ভোরের আগে আবার বের হওয়া প্রভাতফেরির জন্য—যেখানে পুরো গ্রাম একসঙ্গে হাঁটত, গাইত, ফুল দিত।
প্রভাতফেরি শেষ হলেই দিনটি থেমে যেত না; বরং তখনই শুরু হতো আরেক পর্ব। স্কুল প্রাঙ্গণ পরিণত হতো গ্রামের সাংস্কৃতিক মঞ্চে। নাটক, গান, আবৃত্তি, সবকিছুতে অংশ নিতেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এমনকি অভিভাবকেরাও। টিনের ছাউনি, কাঁচা মাটির মেঝে আর ভাঙা বেঞ্চের স্কুল যেন একদিনের জন্য হয়ে উঠত পুরো গ্রামের কেন্দ্রবিন্দু।
পাশের গ্রামের স্কুলের সঙ্গে চলত প্রতিযোগিতা। কার আয়োজন বড়, কার নাটক বেশি ভালো, কার মিছিল দীর্ঘতর। বাইরের নায়ক-নায়িকা থাকলেও অধিকাংশ চরিত্রে অভিনয় করতেন গ্রামের মানুষই, আর দর্শকও ছিল সেই গ্রামেরই প্রতিটি মানুষ। একুশ তখন কেবল স্মরণ নয় বগরং ছিল একটি সামাজিক বন্ধনের উৎসব।
আজ বহু বছর পর দাঁড়িয়ে তিন ভিন্ন ভৌগোলিক স্মৃতি। তবে, ঢাকার নাগরিক আয়োজন, মফস্বলের আত্মীয়তাপূর্ণ উদযাপন, আর গ্রামের সম্মিলিত আবেগ সব একই সুতোয় গাঁথা বলে মনে হয়।
অবকাঠামো বেড়েছে, তৈরি হয়েছে নতুন নতুন স্থায়ী শহীদ মিনার, অনুষ্ঠান হয়েছে আরও আনুষ্ঠানিক; কিন্তু অনেকেরই মনে হয় কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই অপেক্ষা, সেই প্রস্তুতি, সেই কষ্টের ভেতরের আনন্দ। আগে সামর্থ্য কম ছিল, কিন্তু অংশগ্রহণ ছিল সর্বজনীন; এখন সুবিধা বেশি, কিন্তু সময় কম, একসঙ্গে থাকার অবকাশও কম। তবু একুশ এলেই মানুষ ফিরে যায় সেই শৈশবে—গালে আঁকা অ আ ক খ, হাতে ধরা ফুল, কুয়াশা ভেজা পথ, কিংবা নিজের হাতে বানানো মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছোট্ট শিশুতে।


