দেশজুড়ে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। আর উত্তরে হাড়কাঁপানো শীতে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। রাজশাহীতে একদিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে নেমে এসেছে ৭ ডিগ্রিতে। এটি এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে এ অঞ্চলে বইছে ঠান্ডা বাতাস।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজশাহীতে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল শতভাগ। এ অঞ্চলে সকালজুড়ে কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া বিরাজ করলেও কোনো বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়নি।
শীতের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বয়স্ক ও শিশুরাও। এ ছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা নারী, শিশু ও বয়স্করা তীব্র শীতে বিপাকে পড়েছেন।
ঘন কুয়াশার কারণে ভোরে এখানকার সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। সকালে হেডলাইট জালিয়ে প্রধান প্রধান সড়কে গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে।
এদিকে আগামী কয়েকদিন রাজশাহী অঞ্চলে শীতের তীব্রতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম।

একেবারে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়েও দিন দিন বাড়ছে শীতের তীব্রতা। হিমালয়ের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় উত্তর দিক থেকে আসা হিমেল বাতাসে জেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই তাপমাত্রা এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসায় শীতের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল শতভাগ এবং বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬ থেকে ৮ কিলোমিটার। ফলে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
গত কয়েকদিন ধরে ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা। কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না। সকাল ও সন্ধ্যার পর কুয়াশার ঘনত্ব আরও বেড়ে যাওয়ায় সড়ক ও মহাসড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

তীব্র শীত ও কুয়াশার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন। শীতের কারণে নিয়মিত কাজে যেতে পারছেন না। এতে তাদের দৈনন্দিন আয় কমে গেছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে দিনমজুর, চা শ্রমিক, পাথর শ্রমিকসহ খেটে খাওয়া মানুষেরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
ভ্যানচালক রাকিব হাসান জানান, শীতের কাপড় অনেকগুলো পরিধান করেও রক্ষা পাচ্ছি না। শরীরের কোনো অংশ ঢাকা না থাকলেই হিম শীত অনুভূত হচ্ছে। ভাড়ার জন্য সকাল থেকে বের হলেও কোনো ভাড়া পাচ্ছি না, শীতে বাইরে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।
চা শ্রমিক হাজিরুল হক বলেন, অনেক শীত পড়েছে। চা বাগানে পাতা কাটতে অনেক কষ্ট হচ্ছে৷ আমাদের কেউ খোঁজখবর নিচ্ছে না৷
এদিকে, তীব্র শীত ও একটানা কুয়াশার কারণে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানান, আগামী কয়েকদিন সকাল ও সন্ধ্যায় কুয়াশা থাকতে পারে এবং তাপমাত্রা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় মারাত্মক শীত অনুভূত হচ্ছে। বয়ে যাচ্ছে উত্তরের হিমেল হাওয়া। সাথে ঘন কুয়াশা। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরছে।
এ অঞ্চলে দুর্ঘটনা এড়াতে চালকরা হেডলাইট জ্বালিয়ে ও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে চলাচল করছেন।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, এদিন সকাল ৯টায় এ অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা এ মৌসুমে জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৩ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এ জেলার তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়।
আর ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি এ যাবতকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরাও একদিকে হাড় কাঁপানো শীত, অন্যদিকে হিমেল হাওয়া ও কুয়াশার কারণে ব্যাপক শীতে বিপাকে পড়েছে প্রাণীকুলও। গত তিন দিন ধরে এ অঞ্চলে সূর্যের কোনো দেখা নেই। ফলে প্রচণ্ড শীতে বেকায়দায় এ জেলার মানুষ।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, দু-একদিনের মধ্যে তাপমাত্রা আরও উঠানামা করতে পারে। মঙ্গলবার সকাল ৬ টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯৮ শতাংশ।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সামছুর রহমান জানান, তীব্র শীতে শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। তাদের ঠিকঠাক গরম কাপড় পড়িয়ে রাখতে হবে এবং অহেতুক ঘরেরে বাইরে বের করা যাবে না। শিশুদের ঠান্ডা লাগলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
দিনাজপুর জেলাও এখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ তোফাজ্জল হোসেন জানান, শীতের এই তীব্রতা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। জেলায় ৪ জানুয়ারি থেকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দিনাজপুর শিশু হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
এদিকে জেলা-উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন এনজিও, সামাজিক সংস্থা শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ করছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় কম।


