ঈদযাত্রার প্রথম দিনেই ঢাকা থেকে নির্ধারিত সময়ে যাত্রা শুরু করতে পারেনি বেশ কিছু ট্রেন। শনিবার সকালে কমলাপুর ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্ল্যাটফর্মজুড়ে যাত্রীরা ব্যাগ ও লাগেজ হাতে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরায় ট্রেনের এই বিলম্ব নিয়েও বেশিরভাগ যাত্রীর চোখে-মুখে ছিল আনন্দ।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশন থেকে অন্তত ৯টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। তবে এই ৯টি ট্রেনের মধ্যে সাতটি ট্রেনই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে স্টেশন ছাড়ে। ট্রেনগুলো সর্বনিম্ন ১৫ মিনিট থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পৌনে দুই ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় বিলম্বে যাত্রা শুরু করেছে।
অবশ্য রেল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে এই সামান্য বিলম্বকে খুব একটা বড় দেরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
সময়সূচি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও নীলসাগর এক্সপ্রেস স্টেশন ছাড়ে সকাল সাড়ে ৭টায়। সকাল সাড়ে ৭টার তিস্তা এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় সকাল ৮টা ১০ মিনিটে। উত্তরাঞ্চলগামী বুড়িমারী এক্সপ্রেস সকাল সাড়ে ৮টায় ছাড়ার কথা থাকলেও ট্রেনটি কমলাপুরে এসে পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে।
বুড়িমারী এক্সপ্রেসের যাত্রী পারভেজ আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের ট্রেন সব সময়ই দেরি করে। কর্তৃপক্ষ বলছে ট্রেন আসতে কিছুটা দেরি হতে পারে। অনেক যুদ্ধ করে অনলাইনে টিকিট কেটেছি, ফলে সময়মতো ট্রেন না পেলে এই গরমে ভোগান্তি আরও বাড়বে।’
তবে সড়ক পথের তীব্র যানজটের ভোগান্তি এড়ানো যাবে ভেবে এই বিলম্বটুকু মেনেই যাত্রীরা নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হন। স্টেশনে অপেক্ষমাণ অনেক যাত্রী বলছিলেন, বছরজুড়ে নানা কষ্টের পর পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আনন্দের কাছে এসব ভোগান্তি খুব একটা বড় হয়ে ওঠে না। এই আনন্দের মধ্যেও কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করতে ছাড়েননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, ‘প্রতিবারই আমরা ঈদ যাত্রার সময় অনেক আশ্বাস পাই এবং এবারও পেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে কি লাভ হলো, ট্রেনও লেট করেছে আর বগির অবস্থাও তেমন ভালো না। শুধু পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাব বলেই সব কষ্ট সয়ে যেতে হচ্ছে।’
ট্রেন বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার মো. কবীর উদ্দীন টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, সকাল থেকে যেসব ট্রেন কিছুটা দেরিতে ছেড়েছে, সেগুলো মূলত অপারেশনাল কারণে হয়েছে। এই বিলম্বকে কোনোভাবেই শিডিউল বিপর্যয় বলা যাবে না।
এদিকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম ঘুরে যাত্রীদের সার্বিক খোঁজখবর নেন রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। তিনি নিজে যাত্রীদের কাছে গিয়ে জানতে চান, অনলাইনে টিকিট কাটতে কিংবা নির্ধারিত আসনে বসে যাত্রা করতে তাদের কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা।
যাত্রীরা মহাপরিচালককে জানান, ঈদযাত্রার প্রথম দিন হওয়ায় স্টেশনে এখনো উপচে পড়া বা অনিয়ন্ত্রিত ভিড় তৈরি হয়নি। যার ফলে নির্ধারিত আসন খুঁজে পেতে কিংবা ট্রেনে উঠতে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
তবে বেশ কয়েকজন যাত্রী ট্রেনের ভেতরের পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, ট্রেনের কিছু বগিতে ফ্যান নষ্ট হয়ে আছে, বসার সিট ভাঙা এবং টয়লেটগুলো অত্যন্ত অপরিষ্কার ও নোংরা।
উল্লেখ্য, এবার ২৫ মে থেকে শুরু হবে ঈদে সরকারি ছুটি। শনিবার যারা ঢাকা ছেড়েছেন তাদের বেশির ভাগই মূলত চাকরিজীবীদের স্বজন, সন্তান, ছোট ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থী, যাদের ঈদের আগে ঢাকায় জরুরি কাজ তুলনামূলকভাবে কম।
দাদা-দাদির সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে বাবা, মা ও ফুপির সঙ্গে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে ছয় বছরের ছোট্ট শিশু আতিকা আলম। রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাকে মনের আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছে সে। ঈদ আর গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আনন্দে তাকে ধরে রাখা দায়।
আতিকার মা নুসরাত জাহান বলেন, দাদা-দাদির সঙ্গে ঈদ করবে বলে মেয়েটি অনেক দিন ধরেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। পরিবারের সবাই একসঙ্গে হওয়াটাই ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
একই অনুভূতির কথা জানান ট্রেনের আরেক যাত্রী মো. স্বপন। তিনি বলেন, টিকিট পাওয়া থেকে শুরু করে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়ার সবকিছুতেই একটু কষ্ট হয়েছে। কিন্তু বাড়ি পৌঁছে মা-বাবার সঙ্গে দেখা হবে এবং পরিবারের সবাই একসঙ্গে ঈদ করব, এই ভাবনাতেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাচ্ছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী খুরশিদ আলম নিজের পরিবারকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে কমলাপুর স্টেশনে এসেছিলেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত তাকে অফিস করতে হবে। তাই পরিবারের সদস্যদের আগেভাগেই ট্রেনে করে দেশের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত সার্বিক যাত্রা তার কাছে নির্বিঘ্নই মনে হয়েছে।


