চরম সংকটে পড়েছে জাতীয় মাছ ইলিশের জীবনচক্র। এই মাছের সুরক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও ফল মিলেছে উল্টো। ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে উৎপাদন।
রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজার ও রায়ের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজার ভর্তি ছোট ইলিশ। জিগাতলা ও ধানমন্ডি এলাকার অলিগলিতে ঝুড়ি বোঝাই জাটকা বিক্রি করছে ফেরিওয়ালারা।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক ফিরোজ আহমেদ বলেন, মাছগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। যদি আরও অন্তত এক বছর সময় দেওয়া হতো, তবে ইলিশ আরও বড় হতো।
সংকুচিত হচ্ছে অভয়াশ্রম
ইলিশ মাছের অবাধ চলাচল ও নিরাপদে প্রজননের জন্য সরকার বিভিন্ন নদীর বেশ কিছু অংশকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে। এগুলো হচ্ছে: চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ কিলোমিটার; ভোলার মদনপুর বা চর ইলিশা থেকে চর পিয়াল পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার; ভোলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চর রুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার; পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার; শরীয়তপুরের নিম্ন পদ্মার ২০ কিলোমিটার এবং হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, গজারিয়া ও বরিশাল সদর উপজেলার সংলগ্ন মেঘনা নদীর প্রায় ৮২ কিলোমিটার।
এই অঞ্চলগুলো ইলিশের প্রধান প্রজনন ও ডিম ছাড়ার স্থান হিসেবে স্বীকৃত।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ দূষণ এবং সংরক্ষণ আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে এই সুরক্ষিত আবাসস্থলগুলোও এখন বিপন্ন।
আগে একটি আন্তর্জাতিক ইলিশ গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেছেন শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন মাছের প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলোকে ধ্বংস করে ফেলছে।
তিনি জানান, পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক এলাকা ছিল ইলিশের একটি প্রধান আবাসস্থল। এখন, শিল্পকারখানার প্রভাবে নদীতে আগের চেয়ে বেশি পলি জমছে। পরিবেশ বদলে গেছে, ফলে নদীতে কখনও কখনও পর্যাপ্ত পানিও থাকে না। তাই এই এলাকা এখন আর ইলিশের জন্য উপযুক্ত নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাছ ধরার উন্নতমানের অথচ অবৈধ ট্রলিং জালের ব্যাপক ব্যবহার ইলিশের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলেও জানান তিনি। এতে সমগ্র উৎপাদন প্রক্রিয়া সংকুচিত হয়ে গেছে। হুমকিতে পড়েছে ইলিশের জীবনচক্র।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু কাউসার দিদার বলেন, জেলেরা এখন ইকো সোনার, ফিশ ফাইন্ডার ও ইকো সাউন্ডার দিযে মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে। এ ধরনের প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার ইলিশের জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করে। এছাড়া, নদীর মোহনা জুড়ে হাজার হাজার অবৈধ জাল নদীতে মাছ প্রবেশের স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
নিম্নমুখী উৎপাদন
উৎপাদন বাড়াতে সরকার ২০২০ সালে ২৫০ কোটি টাকার একটি ইলিশ সংরক্ষণ প্রকল্প চালু করে। কিন্তু এর ফলাফল ছিল মিশ্র। প্রকল্পের প্রথম তিন বছরে ইলিশ উৎপাদন ২১ হাজার মেট্রিকটন বাড়লেও চতুর্থ বছর আগের চেয়ে ৪১ হাজার মেট্রিকটন কমে যায়।
এ বছরও খুব বেশি সুখবর দিতে পারছেন না মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারাসহ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উৎপাদনের নিম্নমুখী প্রবণতা এবারও অব্যাহত থাকবে।
ভোলা সদরের ট্রলার মালিক সৈয়দ জুলফিকার মাহমুদ জানান, গত ১০ বছরে ইলিশের উৎপাদন অন্তত ২৫ শতাংশ কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অনকূলে থাকলে সাগর বা নদী মোহনায় বছরে ১৫ থেকে ২০ বার ট্রলার পাঠানো যায়। এর মধ্যে পাঁচ থেকে দশটি ট্রিপে ট্রলার ভর্তি মাছ আসে।’
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, ‘উৎপাদন কমার জন্য প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি অব্যবস্থাপনাও আংশিক দায়ী।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংরক্ষণ আইনের দুর্বল প্রয়োগ ইলিশের উৎপাদন হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে বলেও মনে করেন তিনি।
ছোট মাছ, সংকুচিত আশা
শুধু যে উৎপাদন কমছে তা-ই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের আকারও ছোট হয়ে গেছে। বড় ইলিশ এখন দুষ্প্রাপ্য। এমনকি এ বছরের ভরা মৌসুমেও বেশিরভাগ জালে জাটকা এবং ছোট মাছই ধরা পড়েছে।
ঢাকার কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন খান জানান, দেড় কেজি ওজনের চেয়ে বড় ইলিশ খুবই বিরল। এক কেজি ওজনের আশপাশে কিছু পাওয়া যায়, তবে চড়া দামের কারণে এগুলোর বিক্রি কমে গেছে। বেশিরভাগ ক্রেতাই ৩০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছ কিনছেন।
বরিশালের প্রবীণ পাইকারি ব্যবসায়ী জহির শিকদারও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় এ বছর প্রচুর ইলিশ ধরা পড়েছে। কিন্তু বেশিরভাগই ছোট, ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম ওজনের।’
কক্সবাজার ট্রলার মালিক সমিতির পরিচালক বংশী সওদাগর জানান, এ বছর তারা বেশিরভাগই জাটকা ধরেছেন। এর পর ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ। বড় মাছ খুব কম।
ভরা মৌসুমেও কেন বড় মাছের এত অভাব, জানতে চাইলে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘অবৈধ ট্রলিং জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মাছগুলো বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেক ইলিশ প্রথমবার ডিম দেওয়ার পর সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সময় আটকা পড়ে। ট্রলিং জালগুলো টানটান হলে এর ফাঁস আরও ছোট হয়ে যায়, ফলে সবচেয়ে ছোট মাছও ধরা পড়ে। মৎস্য আইন প্রয়োগে শৈথিল্যের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন জালের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।’
আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো সমাধান হবে না বলেও মত দেন তিনি।


