দেশের নদী আর রেলপথ এখন অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ ফেলার ‘নিরাপদ ভাগাড়’ হয়ে উঠেছে। নদী ও রেললাইন থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে তৈরি করেছে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট।
তদন্তকারীরা বলছেন, পানি আর ট্রেনের নিচে ফেলে দেওয়ায় বেশির ভাগ মরদেহের আলামত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অপরাধীদের চেনা তো দূরের কথা, ভুক্তভোগীদের পরিচয় বের করতেই পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, পেশাদার খুনিরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে মরদেহ ফেলার এই পথ বেছে নিচ্ছে। অন্য কোথাও হত্যার পর প্রমাণ পুরোপুরি মুছে ফেলতে এবং মরদেহ যাতে কেউ চিনতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে নদী বা রেললাইনে ফেলে দেওয়া হয়। এই চতুর কৌশলের কারণে তদন্তের কাজ অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে, পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। আর বিচার না পেয়ে চরম হতাশায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
তুরাগ নদীর মরদেহ ও বিতর্ক
সম্প্রতি ঢাকার তুরাগ নদী থেকে মাত্র তিন দিনের মধ্যে চারটি মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর এই সংকট নতুন করে আলোচনায় আসে। স্বজনদের দাবি, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত তিনজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অভিযোগ ওঠে, একটি মিছিলে অংশ নেওয়ার পর তাদের হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অবশ্য পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, মো. সুমন নামের এক ব্যক্তি পিকনিকে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে ডুবে মারা গেছেন। তবে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে পুলিশের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সুমনের এক আত্মীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পুলিশ আগে থেকে লিখে রাখা একটি কাগজে তাদের স্বাক্ষর নিয়েছিল। এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের স্বচ্ছতাকে সন্দেহের মুখে ফেলেছে।
নৌপুলিশের হিসাবে দেখা গেছে, গত দুই বছরে দেশের নদীগুলোতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ৩৬ মরদেহ উদ্ধার হতো, সেখানে গতবছর জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১৭ মাসে মোট ৭৪৯টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। অর্থাৎ, এখন মাসে গড়ে ৪৪টি মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে, যা আগের চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। তবে মৃত্যুর এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে পুলিশ সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ দেখাতে পারেনি।
পরিচয় শনাক্তের সংকট
নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় বের করা পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গত ১৭ মাসে উদ্ধার হওয়া ৭৪৯টি মরদেহের মধ্যে ২১৯টি মরদেহের পরিচয় এখনো মেলেনি। এসব ঘটনায় ৫৫টি হত্যা মামলা ও ৩১৪টি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই ১৬১টি মরদেহ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নৌপুলিশের প্রধান মো. রেজাউল করিম জানান, লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে সঙ্গে সঙ্গে হত্যার মামলা নেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, মরদেহ চেনার মূল উপায় হলো আঙুলের ছাপ। কিন্তু পানিতে ভেসে থাকা দেহ বেশি পচে গেলে আঙুলের ছাপ আর নেওয়া যায় না। আবার যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই, তাদের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখাও সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতিতে ফরেনসিক দলগুলো লাশের ডিএনএ নমুনা রেখে দেয়, যা পরবর্তীতে স্বজনদের খোঁজে শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করে।
রেললাইনে দিনে চার মৃত্যু
রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশের রেললাইনগুলোতে প্রতিদিন গড়ে চারজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক মৃত্যুই দুর্ঘটনা কিংবা আত্মহত্যা হলেও, কর্মকর্তাদের মতে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অপরাধীরা হত্যাকাণ্ডকে দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে মরদেহ এনে রেললাইনের ওপর ফেলে রেখে যায়।
গত ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে রেলওয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৫ হাজার ৩৬২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা এর মধ্যে ৭৬৫টি মৃত্যুকে সন্দেহজনক মনে করেছেন এবং পরে ৮১টি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পেয়েছেন। ২০২১ সাল থেকে এই সংক্রান্ত ৫০০টিরও বেশি মামলা করা হয়েছে।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি জিল্লুর রহমান জানান, তদন্ত ভিন্ন খাতে ঘোরাতে প্রায়ই রেললাইনে মরদেহ এনে ফেলে রাখা হয়। তবে রেলওয়ের পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন জানান, এর বাইরে পারিবারিক কলহের কারণে আত্মহত্যা, ট্রেনের ছাদে চড়ে ভ্রমণের সময় নিচে পড়ে যাওয়া, অসতর্কভাবে লাইন পার হওয়া এবং কানে ইয়ারফোন গুঁজে রেললাইনে হাঁটার কারণেও প্রচুর মানুষ প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন।


