ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল কেনার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। পেট্রল, অকটেন, ডিজেল ও গ্যাস বিক্রির ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, যানজট এবং কিছু পাম্পে বিক্রি সাময়িক বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। বাইকার এবং পরিবহন খাতের লোকজন বিশেষভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এদিকে রাজধানীতে পেট্রল পাম্প পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।’ তিনি আতঙ্কিত হয়ে গ্রাহকদের অযথা জ্বালানি মজুত না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজধানীতে ইফতারের সময়ও তেল কিনতে দীর্ঘ লাইন
বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে রাজধানীজুড়ে ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিজয় সরণি, মহাখালী ফ্লাইওভার, নাবিস্কো মোড় ও সমকালের মোড় পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক বাইকার মোটরসাইকেলের ওপর বসে ইফতার করেছেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী হুমায়ুন কবির রনি বলেন, ‘প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। ইফতারের জন্য সাময়িক বিরতি, তারপর আধাঘণ্টার মধ্যে তেল নিতে পারব আশা করি।’

সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেড ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত গ্রাহকরা চাহিদা মতো তেল নিতে পাচ্ছেন। কোনো লিমিট করা হয়নি। তবে নাজিউর রহমান নিপ্পন নামে রাইড শেয়ারিং চালক বলেন, ‘সর্বোচ্চ ২ লিটার তেল নেওয়ার নতুন নিয়ম জারি হতে পারে, যা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।’
তেজগাঁও এলাকার সিটি ফিলিং স্টেশনে বিকাল ৩টার দিকে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রল শেষ হয়ে যায়। ফলে পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। মোটরসাইকেল আরোহীরা তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পরীবাগ ও শাহবাগ এলাকায় ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে।
এস এম আজমীর হোসেন কল্লোল বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে দেশে তেলের বাজার অস্থির হতে পারে। তাই আতঙ্কে পাম্পে ভিড় জমেছে। অনেকেই অতিরিক্ত তেল নিয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু পাম্পে তেল নেই।’
কুমিল্লায় সরাসরি গাড়িতে তেল সরবরাহ
কুমিল্লার ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল নিতে সকাল থেকে যানবাহনের চাপ বাড়ে। বিশেষ করে সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কিছু স্টেশনে খোলা কনটেইনারে আগাম তেল মজুত করতে দেখা গেছে।

কিছু সময়ের জন্য বিক্রি বন্ধ রাখার পর শুধু যানবাহনে সরাসরি তেল দেওয়া হয়। দেবীদ্বার পান্নারপুল ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশন ম্যানেজার খালেদ হোসেন বলেন, ‘যানবাহনের চাপ কমাতে সিরিয়াল মেইনটেইন করা হচ্ছে।’
রাজবাড়ীতে তেলের তীব্র সংকট ও উপচে পড়া ভিড়
রাজবাড়ীতে হঠাৎ তেলের সংকট দেখা দেয়। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হয় ফিলিং স্টেশনের সামনে। তেলের চাহিদা মেটাতে পাম্পগুলো সীমিত বিক্রি করছে।
রাজবাড়ীর পলাশ ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার বিপুল কুমার বৈদ্য বলেন, ‘মেঘনা পেট্রোলিয়াম থেকে তেল পাইনি। আমাদের পাম্পের মজুদ রোববার পর্যন্ত চলবে, তারপর কী হবে নিশ্চিত নয়।’

মোটরসাইকেল চালক রহমত আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘সারা দিন চালিয়ে তেল খুঁজে ব্যর্থ। ১০০-২০০ টাকার তেল দিয়ে সারা শহর চালানো যায় না।’ কলেজছাত্র তানভীর আহমেদ বলেন, ‘জরুরি কাজে বের হলেও তেলের সংকটের কারণে চলাচল বন্ধ হওয়ার শঙ্কা।’
রাজশাহীতে তেল সরবরাহে ঘাটতি
রাজশাহী বিভাগের ফিলিং স্টেশনগুলোতেও পেট্রল ও অকটেনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তেল না পাওয়া বা সীমিত বিক্রি হওয়ায় কয়েকটি স্টেশন সাময়িক বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, রাজশাহীর ২৭৯টি ফিলিং স্টেশন গত তিন দিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না।
নগরীর বাইকার টনি বলেন, ‘বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাইনি।’
সিলেটে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত চাপ
সিলেটে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আতঙ্কে পাম্পে ভিড় বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটরসাইকেল প্রতি ২০০-৩০০ টাকার বেশি তেল বিক্রি করা হচ্ছে না।

সিলেট বিভাগীয় পেট্রল পাম্প মালিক সমিতি জানিয়েছেন, তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনো দাম বাড়ার সুযোগ নেই।
গাইবান্ধায় তেল সংকট, ফিলিং স্টেশনে উপচে পড়া ভিড়
গাইবান্ধায় হঠাৎ তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। অনেক স্টেশনে তেল শেষ হয়ে গেছে, আর কিছু স্টেশনে সীমিত বিক্রি চলছে।
উত্তরবঙ্গের প্রধান ডিপো সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি থেকে তেল না পাওয়ায় সমস্যা বেড়েছে। মোটরসাইকেল চালকরা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরছেন তেল পেতে।

মোটরসাইকেল চালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “তেল না পেলে বাড়ি যাওয়া অসম্ভব হবে।”
নাটোরে ডিজেল নেই, পাম্পে তেল কেনার হিড়িক
নাটোরের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাম্পগুলো ১০০-৪০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। কৃষক ও চালকরা সমস্যায় পড়েছেন।


