ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অন্তত ২,৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)। এর আগে, মঙ্গলবার দেশটিতে আংশিকভাবে ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর সরকারি এক কর্মকর্তা জানান, ইরানজুড়ে বিক্ষোভে অন্তত দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
বার্তাসংস্থা এপির খবরে বলা হয়, এইচআরএএনএ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত দুই হাজার ৪০৫ জন বিক্ষোভকারী, ১৪৭ জন সরকারপন্থি এবং ১২ শিশু রয়েছে। এছাড়া বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া নয়জন সাধারণ নাগরিকও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির হিসাবে, গত দুই সপ্তাহে বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও প্রথমবারের মতো অনেক সংখ্যার মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করেছে। তাদের খবরে বলা হয়, ‘সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে দেশকে বহু শহীদ উপহার দিতে হয়েছে।’ তবে ইরানের কর্তৃপক্ষ এখনও সরকারিভাবে বিস্তারিত কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ইরানের ৩১টি প্রদেশের সবগুলোতেই ছয় শতাধিক বিক্ষোভ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো বিক্ষোভ নিয়ে খুব কম তথ্য দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতেও শুধু বিচ্ছিন্নভাবে গুলির শব্দ বা রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
সংস্থাটির প্রতিনিধি স্কাইলার থম্পসন বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘এই সংখ্যা (নিহতের) ভয়াবহ। মাত্র দুই সপ্তাহে এটি ২০২২ সালের মাহসা আমিনি আন্দোলনের চার গুণ।’ নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
এদিকে প্রায় চারদিন পর মঙ্গলবার ইরানে ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিফোন সংযোগ আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর দেশটির জনগণ বিদেশে ফোন করে সবশেষ পরিস্থিতি জানাতে পেরেছেন।
তারা বলছেন, ইরানের ইতিহাসে সাম্প্রতিক বছরগুলোর যেকোনো আন্দোলনের তুলনায় এবারের মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। অনেকেই বর্তমান বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময়কার সহিংসতার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

গত ২৮ ডিসেম্বর দেশটির মুদ্রার ব্যাপক দরপতন, তীব্র মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই বিক্ষোভ দমনে সরকার বল প্রয়োগ করায় ধীরে ধীরে তা সরকারের বিরুদ্ধে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
তেহরানের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধে রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বিপ্লবী গার্ডের আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ ও সাদা পোশাকধারী নিরাপত্তা সদস্যদেরও বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে।
বিক্ষোভ চলাকালে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বন্ধ রয়েছে অনেক ব্যাংকের ব্যাংকিং কার্যক্রমও।
বিক্ষোভকারীরা স্বেচ্ছায় দোকানপাট, বাজার বন্ধ রাখায় সরকারি নির্দেশে অনেক দোকানপাট জোর করে খোলা রাখতে বলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
অনেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য ইলন মাস্কের স্টারলিংকের সহায়তা নেওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনী সেইসব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনাল খুঁজতে অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করা অসংখ্য মানুষের প্রশংসা করেছেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। এই বিক্ষোভের পেছনে উস্কানিদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইরানি জাতি শক্তিশালী এবং শত্রুকে চেনে। ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া হবে।’
দেশটিতে বিক্ষোভে মৃতের সংখ্যা প্রকাশ পেতেই উদ্বেগ জানিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের প্রতিবাদে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি সেসব দেশে ইরানের রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে।
নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্ৎজ বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা এই সরকারের শেষ দিনগুলো দেখছি। সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে, তা কার্যত শেষের ইঙ্গিত।’


