ইরানে বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানি দেশপ্রেমিকদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। শিগগিরই তাদের জন্য সহায়তা আসছে।’
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে অর্থনৈতিক মন্দা, তীব্র মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ইরানের জনগণ। ওই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী বল প্রয়োগ করলে ধীরে ধীরে তা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়।
এরই মধ্যে বিক্ষোভে আড়াইহাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)।
ইরানের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই প্রাণহানির সংখ্যা প্রকাশ পাওয়ার পরপরই ইরানি জনগণের পক্ষে বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাদের আন্দোলনকে যথাযথ ও যুক্তিযুক্ত উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের যেকোনো মূল্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। অধিকার ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।’
তিনি আরও জানান, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওয়াশিংটন সব ধরনের আলোচনা স্থগিত রেখেছে।
সেইসঙ্গে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করে এমন দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি, বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের কথাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
এদিকে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের মধ্যে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে প্রাণহানির কথা স্বীকার করেছে ইরান সরকার। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, দেশজুড়ে চলমান অস্থিরতায় প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাননি। বিপুল প্রাণহানির জন্য তিনি ইরানের ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ ও ‘বিদেশি শক্তির উস্কানিকে’ দায়ী করেন।
পশ্চিমা বিশ্বের নিন্দা ও উদ্বেগের মধ্যে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে মস্কোর পক্ষ থেকে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মার্কিন সামরিক হামলার হুমকি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত গভীর অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। ২০২২ সালে ‘হিজাব আইন’ লঙ্ঘনের অভিযোগে কুর্দি তরুণী মাহাসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় সৃষ্ট আন্দোলন এবার অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করেন তারা।
তবে আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে রেভ্যুলশনারি গার্ডস কর্পস কিংবা কোনো সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বড় ধরনের ভাঙন দেখা যায়নি। তারা এখনও সরকারের পক্ষ হয়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করছেন।
ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভের ছোট ছোট ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের প্রাপ্যতার প্রমাণ মিলেছে। তদন্তের স্বার্থে তারা বিভিন্ন বিক্ষোভকারীর ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও যোগাযোগ সরঞ্জাম জব্দ করছে। কিছু এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইন্টারনেট সংযোগ ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম তল্লাশির ঘটনা ঘটছে বলেও জানা গেছে।


