ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানের একটি শিল্প এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। হামলার সময় কারখানাটি সচল ছিল এবং ভেতরে শতাধিক শ্রমিক কাজ করছিলেন।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্সের খবরে বলা হয়, শনিবার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানা কারখানাটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র তৈরি করা হতো।
এ ছাড়া শনিবার ইসরায়েলের এক হামলায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ জালালি-নাসাব নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চত করেছে ইরানের সেনাবাহিনী। কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলে, ‘তিনি দেশ রক্ষার দায়িত্ব পালনে শহীদ হয়েছেন।’
শনিবার ইরানও নতুন করে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বার্তা সংস্থা এএফপি–এর সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, এদিন জেরুজালেম শহরের আকাশে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর দাবি, তেহরান থেকে ছয় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় এবং কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে বোমা বহনকারী ওয়ারহেড ছিল।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ইলাতে ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া বোমার আঘাতে অন্তত তিনজন আহত হন। আহতদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ১৫তম দিনে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে হামলায় অন্তত এক হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
কেবল ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাই নয় সংঘাত শুরুর পর থেকে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিদেশি ও কূটনৈতিক স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
গত ৮ মার্চ ইসফাহানে গোলাবর্ষণে রাশিয়ার কনস্যুলেট ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে কর্মরত কয়েকজন আহত হন। রাশিয়া এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কনভেনশনের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করে।
ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় শনিবার জানিয়েছে, হামলায় দেশটির ৫৬টি জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসফাহানের ১৭শ শতকের ঐতিহাসিক কেন্দ্র নকশে জাহান স্কয়ার এবং তেহরানের ইউনেস্কো স্বীকৃত গুলেস্তান প্রাসাদ।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউনেস্কো। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরানের মোট ২৯টি বিশ্ব ঐতিহ্য স্বীকৃত স্থানের মধ্যে অন্তত চারটি এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপেও হামলা চালায়। এই দ্বীপটি দিয়েই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়। তবে একটি আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে তেল রপ্তানির কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী–এর নৌ চলাচল ব্যাহত করে, তবে খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপাতত যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে আগ্রহী নন এবং ইরানে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, হামলা চলতে থাকলে তারা বিরোধী পক্ষের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার বলেন, ইরানের পালটা হামলার পর এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো ‘ফাঁকফোকরে ভরা’ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ সময় তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিদেশি আগ্রাসীদের বহিষ্কার করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, যুদ্ধ এখন একটি ‘নির্ণায়ক পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে, যেখানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জয় প্রায় নিশ্চিত। কাজেই প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চলবে।


