ইতিহাসের সেরা ফুটবলার কে?

ইতিহাসের সেরা ফুটবলার কে?
Advertisement
Advertisement

ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি এক পরম শিল্পকলা। আর এই শিল্পের ক্যানভাসে জাদুকরী ছোঁয়ায় অমরত্ব পাওয়া কয়েকজনকে নিয়ে কয়েক যুগ ধরে চলে আসছে বিতর্ক। প্রথমে বিতর্ক ছিল কে সেরা- পেলে নাকি ম্যারাডোনা? পরে তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে লিওনেল মেসির নাম।

অবশ্য গেল দুই দশক ধরে নতুন আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয়। মেসির সঙ্গে সেরার লড়াইয়ে ওঠে আসে পর্তুগালের স্ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম। কেউ কেউ এই তালিকায় ব্রাজিলিয়ান ম্যাজিক রোনালদিনিয়োকেও রাখতে চান।

আসলে সবুজ গালিচায় কার শ্রেষ্ঠত্ব বেশি, তা নিয়ে চায়ের কাপ থেকে শুরু করে ফুটবলবোদ্ধাদের আলোচনা-সমালোচনার ঝড় কখনোই থামার নয়। কারণ প্রত্যেকের খেলার ধরন, মেধা এবং ফুটবলকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দেখে নেওয়া যাক এই মহাতারকাদের নিয়ে ফুটবলবোদ্ধাদের মূল্যায়ন।

পেলে: ফুটবলের আদিম ও নিখুঁত সম্রাট

ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বৈশ্বিক মহাতারকা পেলে ছিলেন যেন এক নিখুঁত ফুটবলীয় ঈশ্বরের সৃষ্টি। তার খেলার মূল শক্তি ছিল অবিশ্বাস্য গতি, দুই পায়ে সমান দক্ষতা, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং বাতাসে ভেসে গোল করার এক সহজাত ক্ষমতা। পেলের মেধা ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে, তিনি ডিফেন্ডারদের পরবর্তী চাল কী হবে তা সেকেন্ডের ভগ্নাংশের আগেই পড়ে ফেলতে পারতেন। তিনটি বিশ্বকাপ জয়ী এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির খেলায় কোনো খামতি ছিল না—তিনি একাধারে ছিলেন গোলদাতা এবং গেমমেকার। আধুনিক ফুটবলের অনেক কৌশলই পেলে সেই ষাট ও সত্তরের দশকে অনায়াসে মাঠের বুকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

ম্যারাডোনা: দ্রোহ ও আধিপত্যের জাদুকর

পেলের যদি নিখুঁত সৌন্দর্য থাকে, তবে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন ফুটবলের মাঠের এক বিদ্রোহী কবি। ম্যারাডোনার খেলার ধরন ছিল মূলত তার বাঁ পায়ের অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ, লোয়ার সেন্টার অব গ্র্যাভিটি এবং শরীরী শক্তি ও গতির এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। প্রতিপক্ষের পাঁচ-ছয়জন ডিফেন্ডারকে একাই কাটিয়ে বল জালে জড়ানোর যে অতিমানবীয় ক্ষমতা তার ছিল, তা ফুটবল ইতিহাস আর দেখেনি। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তার একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় প্রমাণ করে  ম্যারাডোনা শুধু একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরো দলের চালিকাশক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক নেতা। তার মেধা ছিল ক্ষুরধার, যা মাঠের ভেতরের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিকে এক নিমেষে বদলে দিতে পারত।

আরও পড়ুন

লিওনেল মেসি: ‘ভিনগ্রহের’ প্রতিভা

ম্যারাডোনার উত্তরসূরি লিওনেল মেসি ফুটবলকে নিয়ে গেছেন এক অন্য উচ্চতায়। মেসির খেলার ধরনকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ফুটবল পণ্ডিতরা প্রায়ই শব্দের সংকটে পড়েন। জাদুকরী স্পর্শে বলকে পায়ের সাথে আঠার মতো আটকে রাখা, চোখের পলকে গতি পরিবর্তন এবং যেকোনো রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তার। মেসির মেধা কেবল গোল করায় নয়, বরং তার নিখুঁত পাসিং এবং মাঠের দূরদৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে। তিনি যখন মাঠে থাকেন, তখন মনে হয় পুরো খেলাটি তার মনের গতি অনুযায়ী চলছে। বিশ্বকাপসহ ফুটবলের সম্ভাব্য সব ট্রফি ও রেকর্ড নিজের করে নিয়ে মেসি নিজেকে সর্বকালের সেরার বিতর্কে সবার ওপরে দাবিদার করে তুলেছেন।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো: লড়াকু ‘মেশিন’

মেসির যদি ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা থাকে, তবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হলেন কঠোর পরিশ্রম, অবিশ্বাস্য অ্যাথলেটিসিজম এবং লড়াকু মানসিকতার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। রোনালদোর খেলার ধরন ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিল উইং দিয়ে বিদ্যুৎগতির ড্রিবলিং ও নিখুঁত ক্রস করা, যা সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়ে তাকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ‘গোল স্কোরিং মেশিনে’ পরিণত করেছে। বাতাসে তার লাফানোর ক্ষমতা, পেনাল্টি বক্সের ভেতর চিতার মতো ক্ষিপ্রতা এবং দুই পায়ে ও মাথায় গোল করার অবিশ্বাস্য দক্ষতা তাকে অনন্য করে তুলেছে। রোনালদোর সবচেয়ে বড় মেধা হলো তার মানসিক শক্তি—যেকোনো চাপের মুখে দলের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া এবং নিজেকে বছরের পর বছর শীর্ষ স্তরে টিকিয়ে রাখা।

রোনালদিনিয়ো: ফুটবলের বিশুদ্ধ আনন্দ

এই তালিকায় ট্রফি বা গোলের পরিসংখ্যানে রোনালদিনিয়ো হয়তো বাকিদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকবেন। কিন্তু মাঠের ফুটবলে তিনি যা উপহার দিয়েছেন, তাকে এক কথায় বলা যায় ‘বিশুদ্ধ আনন্দ’। রোনালদিনিয়োর খেলার ধরন কোনো ছকে বাঁধা ছিল না। তিনি যখন মাঠে নামতেন, মনে হতো ফুটবলটা কোনো যুদ্ধ নয়, বরং এক পরম উপভোগের উৎসব। তার ‘ইলাস্টিকো’, ‘নো-লুক পাস’ এবং পিচ টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা গ্যালারির দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। তার মেধা ছিল তার সৃজনশীলতায়—যেখানে অন্য খেলোয়াড়রা সাধারণ পাস দেওয়ার কথা ভাবতেন, রোনালদিনিয়ো সেখানে অবাস্তব কোনো জাদুর জন্ম দিতেন। প্রতিপক্ষের সমর্থকরাও তার পায়ের জাদু দেখে দাঁড়িয়ে তালি দিতে বাধ্য হতেন।

শ্রেষ্ঠত্বের অমীমাংসিত মহাকাব্য

ফুটবলবোদ্ধাদের মতে, কে সেরা, সেই প্রশ্নের উত্তর আসলে আপেক্ষিক। কেউ যদি নিখুঁত কার্যকারিতা আর ট্রফি চান, তবে তার পছন্দ হবে পেলে কিংবা মেসি। কেউ যদি একক দক্ষতায় দলকে টেনে তোলার অদম্য আবেগ খোঁজেন, তবে তিনি ম্যারাডোনাকে বেছে নেবেন। আবার কেউ যদি পেশাদারিত্ব, গোল করার ক্ষুধা আর অতিমানবীয় শরীরের ভক্ত হন, তবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোই তার কাছে সেরা। আর যারা ফুটবলের সৌন্দর্য দেখে হাসতে চান, তাদের হৃদয়ে চিরকাল রাজত্ব করবেন রোনালদিনিয়ো।

শৈলী আর মেধার এই ভিন্নতাই ফুটবলকে এত সুন্দর করে তুলেছে। তাই কে সেরা সেই বিতর্কের অবসান হয়তো কোনোদিন হবে না, তবে এই পাঁচ নক্ষত্র যে ফুটবলকে এক একটি ভিন্ন শিল্পকলায় রূপান্তর করেছেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad