বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) এর দুই শিক্ষককে বরখাস্তের ঘটনাকে ‘মবের কাছে আত্মসমর্পণ’ আখ্যা দিয়ে এটিকে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে অবিলম্বে বরখাস্ত দুই শিক্ষককে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইউএপির বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক লায়কা বশির এবং সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এএসএম মহসিনকে বরখাস্তের প্রতিবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন শিক্ষক নেটওয়ার্কের নেতারা। এ সময় সংগঠনটি চার দফা দাবি উত্থাপন করে।
দাবিগুলো হলো অবিলম্বে বরখাস্ত দুই শিক্ষককে পুনর্বহাল করা। বরখাস্তের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করা। ভীতি প্রদর্শন ও মিথ্যা অভিযোগে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির নিরাপত্তা ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করা।
গত রোববার বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই দুই শিক্ষককে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করে। পরদিন সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অনুকূল নয়। বিষয়টির সমাধান ও দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ক্লাস স্থগিত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন আনু মুহাম্মদ, মির্জা তাসলিমা সুলতানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌমিত জয়দ্বীপ ও তানভীর সোবহান।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কামাল চৌধুরী, কাজলি শেহেরীন ইসলাম, সামিও শীশ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামলী শীল। দর্শক সারিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, আইনজীবী মানজুর আল মাতিন ও পরিবেশকর্মী আমিরুল রাজীব উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বক্তারা বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে একটি গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তারা ‘ধর্মকে অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন করছে এবং ‘আগ্রাসী কায়দায়’ ক্ষমতায়িত হওয়ার চেষ্টা করছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষক নেটওয়ার্কের।
বক্তারা বলেন, বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশ বা ভিন্নমত পোষণের কারণে শিক্ষকরা হেনস্তা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘ধর্মানুভূতিকে’ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউএপির দুই শিক্ষককে বরখাস্তের ঘটনা এই প্রবণতারই সর্বশেষ উদাহরণ।
বিবৃতিতে বলা হয়, কলা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান শাখায় সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস ও ধারণা নিয়ে একাডেমিকভাবে সমালোচনামূলক প্রশ্ন তোলা হয়। শিক্ষকরা সেই দায়িত্বই পালন করেন। কিন্তু মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে সুপরিকল্পিতভাবে ও নানা অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করার দাবি এবং সে দাবির মুখে নতজানু হয়ে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ ছাড়াই ইউএপি প্রশাসনের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে একটি নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, লায়কা বশিরের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থেই একাডেমিক স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তার ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, যে বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে জুলাই মাসে লায়কা বশির ও এএসএম মহসিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজপথে নেমেছিলেন, সেই বাকস্বাধীনতাকেই খর্ব করে একটি উগ্র অংশ তার বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতায় জড়ায়।
বক্তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট পোস্টটি ধর্মীয় নয় বরং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে লেখা। এ কথা ব্যাখ্যা করে লায়কা বশির আরেকটি পোস্ট দিলেও তার বিরুদ্ধে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং অনলাইন হয়রানি চলতে থাকে।
এ সময় তার পাশে না দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই উপাচার্য ফোন করে তাকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ করা হয়। পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি করলে তাকে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চাপ দেওয়া হয়। এমনকি তদন্তে গেলে তার সম্মানহানির আশঙ্কার কথা বলে আগেই পদত্যাগ করতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।
পরবর্তীতে নিরাপত্তা শঙ্কায় লায়কা বশির তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও বক্তাদের অভিযোগ, গুগল ফরমের মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৪টি বেনামি অভিযোগ যাচাইযোগ্য নয়। তাকে জবাব দেওয়ার জন্য ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও, তার আগেই তাকে বরখাস্ত করা হয় যা ‘স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী’ বলে মনে করছে সংগঠনটি।
এএসএম মহসিনের ক্ষেত্রেও কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ বা তদন্ত ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বক্তাদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকলেও তাকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


