চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার মামলায় সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আদালত।
সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাহিদুল হক শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি এস ইউ এম নুরুল ইসলাম অভিযোগ গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, চিন্ময়সহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী ধার্য তারিখ থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে।
আলোচিত এই হত্যা মামলার শুনানিকে ঘিরে চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আদালতের মূল ফটকে বসানো হয় তল্লাশিচৌকি। এতে আদালতের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল পৌনে ১০টার দিকে মামলার ২৩ জন আসামিকে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বাকি ১৬ জন আসামি পলাতক রয়েছেন।
পলাতক আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট দুলাল চন্দ্রনাথ ও চন্দন কুমার ধর আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য।
বাদীপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী এবং পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এস ইউ নুরুল ইসলাম আদালতে বক্তব্য রাখেন।
হাজতি আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস নিজেই আদালতে প্রায় ২৫ মিনিট বক্তব্য দেন। এ ছাড়া উপস্থিত অন্য আসামিদের মধ্যে দুইজন সরাসরি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দেন।
উভয়পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি মামলার বাদী পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী এপিপি মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, এটি একটি সংবেদনশীল, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। দেশের জনগণ, আইনজীবী সমাজ, বিচারপ্রার্থী মানুষ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে এটি সরাসরি সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রপক্ষের বিশ্বাস, প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
শুনানির দিন আদালতে হাজির হন নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলামের বাবা জামাল উদ্দিন। আদালত প্রাঙ্গণে তিনি বলেন, ‘আজ আসামিদের বিচার শুরুর আদেশ হয়েছে, আমি এতে খুশি। বিচারটা যেন দ্রুত শেষ হয়। ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেন মরতে পারি এই আমার চাওয়া।’
গত বছরের ১ জুলাই সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় দাসসহ ৩৮ জনকে আসামি করে চট্টগ্রাম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। পরে বাদী নারাজি দিলে একই বছরের ২৫ আগস্ট আদালত আসামি সুকান্ত দত্তসহ মোট ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
গত মাসে মামলাটি বিচার উপযোগী বিবেচনায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর, চিন্ময় দাসের জামিনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় চট্টগ্রাম আদালত এলাকায় আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন।
এ ছাড়া পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও পাঁচটি মামলা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, মামলার আসামিদের মধ্যে চন্দন দাস, রিপন দাস ও রাজীব ভট্টাচার্য আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
স্বীকারোক্তিতে বলা হয়, রিপন দাস আইনজীবী সাইফুল ইসলামের ঘাড়ে বঁটি দিয়ে দুটি কোপ দেন এবং চন্দন দাস কিরিচ দিয়ে কোপান। পরে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা ওই আইনজীবীকে রাস্তায় ফেলে লাঠি, বাটাম, ইট, কিরিচ ও বঁটি দিয়ে ১৫ থেকে ২০ জন মিলে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘটনার উসকানিদাতা হিসেবে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে এই মামলার আসামি করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেন। পরে ফিরোজ খানকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ওই মামলায় চিন্ময় দাসকে ২৫ নভেম্বর ঢাকার একটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।


