বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অনন্য পুরোধা, দেশপ্রেমিক সুরকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আলতাফ মাহমুদ। ১৯৩৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর বরিশালের মুলাদী উপজেলার পাতাচর গ্রামে তার জন্ম। সময়ের পরতে পরতে তার সুর আজ আর কেবল সংগীত নয়, আমাদের জাতিসত্তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আলতাফ মাহমুদ ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি বিশ্বাস করতেন—সংগীত শুধু বিনোদন নয়, এটি প্রতিরোধও হতে পারে। বাঙালির ইতিহাসে তার অবস্থান তাই একজন সুরকার হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ছিলেন মুক্তির সংগ্রামে অবিচল এক যোদ্ধা। তার নাম উচ্চারিত হলেই কানে ভেসে আসে একুশের অমর গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা এই কবিতায় ১৯৫৪ সালে আলতাফ মাহমুদ যে সুরারোপ করেন, সেটিই কালক্রমে হয়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অস্ত্র। এই একটি সুর ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দেয় ঘরে ঘরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন—প্রতিটি সংগ্রামে আলতাফ মাহমুদ ছিলেন সক্রিয়। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকেও তিনি সংগঠিত করেছেন নিরলসভাবে। ছায়ানট ও ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে গান, সুর আর আয়োজনের মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় আগুন জ্বালিয়েছেন। চলচ্চিত্রেও তার অবদান কম নয়। উনিশটি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে তার সংগীত হয়ে উঠেছে সময়ের ভাষ্য, প্রতীকী প্রতিবাদের এক অনবদ্য দলিল।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আলতাফ মাহমুদ আর পেছনে থাকেননি। একজন খ্যাতিমান পরিচয়ের আড়ালে তিনি ঢাকায় নিজের বাসভবনকে রূপ দেন মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানা ও অস্ত্রাগারে। ক্র্যাক প্লাটুনের একজন সক্রিয় গেরিলা হিসেবে জীবন বাজি রেখে তিনি কাজ করেছেন, বিশ্বাস করেছিলেন—এই দেশকে স্বাধীন করতেই হবে, যেকোনো মূল্যে।
৩০ আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানি বাহিনী তার বাসভবন ঘেরাও করে। অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য আদায়ের জন্য তার ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। কিন্তু আলতাফ মাহমুদ ভেঙে পড়েননি, মুখ খোলেননি। শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। এরপর আর কখনো ফেরেননি তিনি। ধারণা করা হয়, সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই এই মহান শিল্পীকে হত্যা করা হয়। তিনি নিখোঁজ হলেও জাতির ইতিহাসে শহীদ হিসেবেই অমর হয়ে আছেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র তাকে স্মরণ করেছে। ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়েও বড় পুরস্কার হলো—বাংলাদেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের হৃদয়ে তার সুরের স্থায়ী আসন।


