ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তরুণ ছাত্র-জনতার নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে ‘সংসদ চলোর’ মতো তারা আর কোনো পার্লামেন্ট অভিমুখী পদযাত্রা বা মিছিল না করার কথা জানিয়েছে।
মঙ্গলবার এক ঘোষণায় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দাবি করেন, সোমবার দেশটির পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকায় সেদিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার গন্তব্য ঠিক হয়। তবে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে দফায় দফায় সংঘর্ষে শতাধিক সমর্থক আহত হওয়ায় তারা আর কোনো পদযাত্রা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পরিবর্তে দিল্লির যন্তর মন্তরে নির্ধারিত স্থানে আগের মতো বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন অভিজিৎ।
সিজেপি প্রতিষ্ঠাতার দাবি, পুলিশের লাঠিপেটা এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল থেকে আহত অন্তত ১৫০ সমর্থক বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উত্তর প্রদেশের এক বিক্ষোভকারী সাহিল সিং রয়টার্সকে বলেন, ‘তারা আমাদের ব্যাপকভাবে মারধর করেছে এবং আমাদের বিক্ষোভস্থল ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে জবাবদিহি চাই।’

দিল্লি পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, সোমবার দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৮০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৮ জন নিরাপত্তারক্ষী ও পুলিশ সদস্য এবং ৬০ জন বিক্ষোভকারী রয়েছেন।
সংঘর্ষের পর ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, দিল্লি ও আশপাশের শহর ও এলাকা থেকে হাজারও বিক্ষোভকারী সোমবার সংসদ অভিমুখে মিছিল করতে যন্তর মন্তরে জড়ো হয়েছিলেন। সেখান থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হয়ে ছোট ছোট মিছিল পার্লামেন্টের আশপাশের মহাসড়কে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে এই পদযাত্রার বিষয়ে দিল্লি পুলিশ সিজেপিকে কোনো অনুমতি না দেওয়ায় বিক্ষোভরতদের ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এরপরও উত্তেজিত ছাত্রজনতা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ মারমুখী অবস্থান নেয়।
মঙ্গলবারও সকাল থেকে জন্তর মন্তরে পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারী জড়ো হন। হালকা বৃষ্টির মধ্যেও তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। বিভিন্ন এলাকায় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ব্যারিকেডের কারণে যান চলাচলেও ধীরগতি সৃষ্টি হয়।
অভিজিৎ দীপকে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আরও তরুণ আহত হোক, আমরা চাই না বলেই সংসদ অভিমুখে মিছিলের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছেন।’ এ সময় পুলিশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে তিনি সমর্থকদের, বিশেষ করে নারীদের কাছে ক্ষমা চান। তার অভিযোগ, পুরুষ পুলিশ সদস্যরা নারী বিক্ষোভকারীদেরও মারধর করেছেন।
অভিজিৎ বলেন, ‘আমরা আর মিছিল করব না, কারণ পুলিশ আবারও তরুণদের ওপর আঘাত করবে।’
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ‘উচ্ছৃঙ্খল, আক্রমণাত্মক ও সহিংস আচরণ’ করেছেন এবং সোমবার জারি করা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছেন।

মূলত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির শিক্ষিত বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করলে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। তে নতুন মাত্রা পায় ভারতের মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষায় (নিট) প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তির জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে শিক্ষার্থীদের আবার পরীক্ষা দিতে হয়। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এ ঘটনা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর দুর্নীতির প্রমাণ।
তার জেরেই গত মে মাসে প্রধান বিচারপতি ও কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ‘আমরাই তেলাপোকা’ ও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে ব্যঙ্গধর্মী হ্যাশ ট্যাগ ছড়িয়ে পড়ে।
ওই পরিস্থিতিতে প্রায় দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা তরুণ- অভিজিৎ দীপকে সামাজিক মাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে সরকারবিরোধী ব্যাঙ্গাত্মক পেজ গড়ে তোলেন। অনলাইনের ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হওয়া এই পেজ মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ে।
অভিজিৎ দেশে ফিরে এলে ককরোচ জনতা পার্টি সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শুরু হয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি যা সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সিজেপির দাবি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে অন্তত ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর অন্তত ১২জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনটি আরও গতি পায় লাদাখের জনপ্রিয় অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনের পর। তিনি ২৮ জুন অনশন শুরু করেছিলেন। শনিবার কর্তৃপক্ষ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ জানিয়েছে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর উত্তপ্ত দিল্লিতে দুই নেতার সঙ্গে বৈঠকের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা তাদের দাবিগুলো নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা করার জন্য সময় চেয়েছেন।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে ওয়াংচুককে মুক্তি দেওয়া, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
ভারতের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মোদি ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আইনপ্রণেতাদের বৈঠকের পর বলেন, ‘যখন আলোচনা সঠিক পথে এগোচ্ছে, তখন পরিস্থিতি খারাপ করা উচিত নয়।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা সফল হয়ে বিক্ষোভ শান্ত হলেও অসন্তুষ্ট তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ ভবিষ্যতে মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসিএলইডির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া বলেন, ‘এটি এমন একটি বিষয়, যা সবাইকে প্রভাবিত করে। সরকারের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা শুধু ক্ষোভ আরও বাড়াবে।’


