২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যালেন্স বা ব্যালান্স অব পেমেন্টস (বিওপি) শক্তিশালী উদ্বৃত্তে ফিরেছে। তবে এই সময়ে আমদানির তুলনায় রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে, যা দেশের বৈদেশিক খাতের পুনরুদ্ধারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বিওপির সার্বিক স্থিতি ৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল।
একই সময়ে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। তবে রিজার্ভের এই উন্নতির বিপরীতে বাণিজ্য হিসাবের চিত্র আরও দুর্বল হয়েছে।
জুলাই-এপ্রিল সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ১৮ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে আমদানি ব্যয় ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৫৮ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বিপরীতে রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৩৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৩২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস এখনও প্রত্যাশিত গতি ফিরে পায়নি, অথচ আমদানি কার্যক্রম ধীরে ধীরে বাড়ছে।
পণ্য বাণিজ্যের বাইরে অন্যান্য খাত থেকেও চাপ বাড়ছে। সেবা খাতের ঘাটতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে প্রাথমিক আয় হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে।
বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বেড়ে ১ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগে ছিল ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। এতে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার চাপ আরও বেড়েছে।
তবে প্রবাসী আয় এই চাপের বড় অংশ সামাল দিয়েছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। মোট বেসরকারি স্থানান্তর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে। এই শক্তিশালী প্রবাহের কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি এক বছর আগের ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে মার্চ পর্যন্ত এ ঘাটতি ছিল মাত্র ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার। এপ্রিল মাসের লেনদেন যুক্ত হওয়ার পর তা ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈদেশিক খাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, আর্থিক হিসাবও বৈদেশিক খাতকে সমর্থন দিয়েছে। এ খাতে উদ্বৃত্ত বেড়ে ৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। তবে এই উন্নতির গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা এক বছর আগে ছিল ১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে পোর্টফোলিও বিনিয়োগও ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
বরং বৈদেশিক খাতের উন্নতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘অন্যান্য বিনিয়োগ’। এ খাতে নিট প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছর ১৮৫ মিলিয়ন ডলার বহিঃপ্রবাহ হয়েছিল। বিশেষ করে বাণিজ্য ঋণ ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ঋণাত্মক ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছিল। অর্থাৎ বৈদেশিক খাতের উন্নতির বড় অংশ এসেছে বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট ও স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন থেকে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চিত্র তুলনামূলক দুর্বল। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছাড় ২০ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বিপরীতে ঋণ পরিশোধ ১৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নিট বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহও ২ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
তবে রিজার্ভ সক্ষমতার উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। পণ্য ও সেবা আমদানির বিপরীতে রিজার্ভ কভার বেড়ে ৫ দশমিক ১ মাসে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৪ দশমিক ২ মাস। শুধু পণ্য আমদানির হিসাবে এ কভার বেড়ে ৫ দশমিক ৭ মাসে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৪ দশমিক ৭ মাস।


